সাবিত্রী জানা ষন্নিগ্রহী - বিবিধ




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

যাযাবরের গৃহবন্দী


আমি যাযাবর-দেহ ছুটতো মন নিয়ে বনের আনাচে- কানাচে। পায়ে হেঁটে বা স্কুটারে। আবার দূর-দূরান্ত ও আকুল হয় ডাকতো। চলে যেতাম রেলগাড়ি চেপে-কানে আসতো ছন্দময় শব্দ-ঝিকঝিক- ঝিকঝিক। কখনো বা একটানা ছুটে চলা ভলভো বাস বা চারচাকার ছোট্ট গাড়ি চেনা অচেনা সাথীসহ আমায় বয়ে নিয়ে যেতো-- দূরদূরান্তে--মন ভরানোর টানে। আবার কখনো কয়েকমাসের জন‍্য উধাও হতাম নিজের চেনা গন্ডী পেরিয়ে-দূর আকাশের গাড়ী চেপে।---এই তো ক'দিন আগের কথা।
আমার খুব ভয় করে-গাড়ি চাপতে। ভয় নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম যাযাবরের জীবনের মতো। আমাদের ছোট্ট নদী শীলাবতীর পাড়ে রামচন্দ্র ঠাকুরকে মনে মনে প্রণাম ক'রে বলতাম--ফিরে এসে এসে আমি তোমায় একটি প্রণাম করবো-আমি আর কিছু চাই না।
এইতো মাস তিনেক আগে কলকাতায় রাত দশটায় ফ্লাইট ঢোকার কথা-ঢুকলো রাত একটায়। ঘুমে কাতর আমি-মাথায় বিরক্তি-মনে সাহস-মুখে হাসি।--আমি ফিরেছি।

বয়েস আমার নেহাত কম ও নয় আবার খুব বেশী ও নয়। তাই বেশখানিক ভনিতা করে ফেললাম। এটুকু না জানালে "লকডাউন"- আমায় কি দিয়েছে তা স্পষ্ট হবে না। আমি তো দেহে মনে ভয় লাগা যাযাবর। এখন ভীতিহীন যাযাবর-কেবল মনে। আশঙ্কা সম্বল যাযাবর-করোণ-কে ভয় না পাওয়া যাযাবর। মন ছুটছে পেছনে-স্মৃতির টানে--চোখ ছুটছে আকাশপানে- গাছপানে-পাখীপানে- পতঙ্গপানে। এমন তো কথা ছিল না। যন্ত্র সভ‍্যতাকে এমন মুষড়ে পড়তে দেখিনি কখনো। বেশ তো ঘুরছিল- চাকাগুলো-পৃথিবী ঘোরা- না সূর্য ঘোরার সাথে সাথে। প্রকৃতির দেবতা সূর্য-চন্দ্র সব নিজের নিয়মে চলেছে-কেবল থেমে গেছে সব চাকা-থমকে গেছে খাটতে যাওয়া শরীরগুলো। বিশ্ব স্তব্ধতা বিশ্বের প্রতিটি কোনকে ভেতরে ভেতরে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। বাচ্চাগুলো  স্কুলপোষাকে পিঠে বইএর বোঝা নিয়ে স্কুলপানে ছোটে না। চলছিল রেলগাড়ি ঝিকঝিক শব্দে-ঠাসাঠাসি মেয়ে-বৌ- বুড়িমা --কাজের বাড়িতে কাজ অপেক্ষা করছে-এই ভাবনায়। ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বাসগুলো নেচে নেচে ছুটে চলতো-পিছু পিছু ছুটতো দিন রোজগেরে মানুষ গুলো ভোরবেলায় একমুঠো গরম ভাত খেয়ে বা টিফিন কৌটোয় ভরে নিয়ে। কলেজস্ট্রিটের রাস্তাটার উপর বস্তাভর্তি জিনিস নিয়ে ঠেলাওয়ালার মন্থরগতিতে বাস-ট্রাম- ট‍্যাক্সি খানিক খানিক বিশ্রাম নিয়ে এগোতো।
বৃদ্ধ দুই শীর্ণ হাতে টানা রিকশার হাতল দুটো দুই বগলে চেপে দুলকি চালে চলতো--যা পয়সা পাবে তা দিয়ে সন্ধেবেলা বুড়িবৌ এর জন্য ঔষধ কিনবে।
এয়ারপোর্ট চত্বরে কয়েক ঘন্টা নিজেকে সমর্পণ করে অপেক্ষা করতো যাত্রীরা- আমি ও করেছি--কখন উড়বে-আমি উড়বো- আমার সাথে অনেকেই। হয় দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে বা সূদূর কোন সমুদ্র পাড়ে। বিশাল গো গো শব্দে  আকাশযান তার যাত্রার সূচনা করতো। থেকে ভেসে আসতো সুন্দরীর গলা আর হাত দিয়ে নির্দেশ--দুর্ঘটনায় কিভাবে নিজেকে বাচাবে- তার মহড়া--দেখে সে কি এক অজানা ভয়---যদি ভেঙে পড়ে!!!
না আজ সব ভয় কেটে গেছে। ---জেগে আছে এক অতিমারীর সজাগ দৃষ্টি। এই বুঝি সন্তর্পণে এসে ধরলো। কে সে!!!!!----
--আর আমার গ্রামের কথা শুনবে? এখানে ও ভয় আছে গো। গ্রাম সড়কের পাশ দিয়ে যখন বালি নিয়ে ট্রাকটরগুলো মাথা নাচিয়ে- দেহ দুলিয়ে ঢেড়েঙ্ ঢেড়েঙ্ উচ্চস্বর ছড়িয়ে ছড়িয়ে এগোয় তখন রাস্তা থেকে দশহস্ত দূরে না সরলে বিপদ আছে। মোরাম মাটির কাঠফাটা রোদ- ভেপসা গরম জ্বালিয়ে দেয় চারপাশ। ভয় করে যখন গ্রামের সরল সহজ মানুষগুলো "রাধা গোবিন্দ"--নামে আকাশ বাতাস ভাসিয়ে দেয় দশদিকে কুড়িটি লাউড স্পিকার দিয়ে। একটানা ছয়দিন--দু'চারদিনের বিরতি-- গ্রামে গ্রামে-- তিনমাস। "হৃদয় বিদরে" -যাবে -না ঘুম-না কোন কথা-সব অসহনীয়। এ তো চেনা ভয়--বছরের পর বছর। বেশ চলছিল--
সব স্তব্ধ খান খান করে দিচ্ছে--একটি শব্দ--"করোণা"। গ্রামের মানুষগুলো তো বাইরে রোদে-জলে খেটে খায়। ওদের বোধহয় ভয়টা একটু কম। তাছাড়া চাল-আটা- আলু থাকলে কি হবে!!গরুর খাওয়ার ঘাস তো মাঠে আছে -আনতে হবে-আনতেই হবে। গরু-বাছুর মরবে-বাচ্চাটা দুধ খেতে পাবে না। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে বিকেলে সবাই চায়ের দোকানটায় একটু আড্ডা না দিলে-কার কেমন মাঠের ফলন হোল -কি সার দিতে হবে-তা আলোচনা হবে কিভাবে??

এই যে আমি আজ ঝোড়ো বাদল দিনে কিছু বলতে চাইছি তার ও সুযোগ ঔ করোণা। বাইরে ঝোড়ো হাওয়ায় গাছের ডালপালা অস্থির--দু'টো ঘুঘু জড় হয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সজনে গাছের ডালে বসে আছে। ওদের বাসাটা বোধহয় ভেঙে গেছে- গতরাতের ঝড়ে। ওরা তো অসহায়--কিচ্ছুটি  বলে না। আসলে ওদের প্রয়োজন আমাদের প্রয়োজন তো এক নয়। আমার বাগানের দুটো লার্ভাকে আমি আমার প্লাস্টিকের কৌটেতে রেখেছিলাম পাখীদের দৃষ্টি থেকে বাচিয়ে -প্রজাপতি হলে আমার বাগানে উড়িয়ে দেবো। আজ এই ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যেই গুটি থেকে প্রজাপতি বের হয়েছে। এখনো ওদের ডানাগুলো শক্ত হয়নি। রোদ লাগবে যে। আচ্ছা ও যদি গাছে থাকতো আজকের ঝোড়ো হাওয়ায় ওরা তো মরে যেতো। বাচার জন‍্য সুরক্ষা চাই যে। তাইতো আমরা আজ গৃহবন্দী। 

দেড়মাস আগে থেকে আমার মনে মাথায় কথা আটকে ছিল-

 *আজ আমি কৃষ্ণ দেখা পাবো-
কৃষ্ণ প্রসাদ খাবো,
 কৃষ্ণ নাম গাবো।
পেলাম কই?
লকডাউনে রই।
এলো যে ছোট্ট দানা,
সে নাকি মারণ কনা।
নামখানা তো খাসা,
গা-টা কাটায় ঠাসা।
গায়ে আছে "মুকুটশোভা",
ভেতরে তো বিষের আভা।
কেউ বা বলে কোভিড-১৯
রোগটি হোল করোণা,
লাগলে পরে ছাড়ে না
 বাইরে যাওয়া মানা।
বাইরে যদি যেতে চাও,
নাকটি আগে বেধে নাও।
ফিরে এসো সাবান দিয়ে,
ধুয়ে নাও হাতটি আগে।
চোখমুখে ও যেন লাগে।
ঢোকে যদি নাকে-মুখে,
আশ্রয় নেবে দুই চোখে।
বিপদ বিশাল ধরবে যারে,
গলায় যেয়ে ঘাপটি মারে‌।
এ তো আবার নয়কো জীব-নয়কো জড়,
সজীব কোষে মহাখুশি-
বঙ্শবৃদ্ধিতে আচ্ছা দড়।
মুকুটখানা বাইরে ফেলে,
ফিতেটা যাবে হেলেদুলে।
পেয়ে যাবে জীবনখনি,
কত যে হবে-নাইবা গুনি।

বিশ্বভুবন স্তব্ধ আজি-আমরা অসহায়,
নিকটজনে দূরে আছে-
কি খাচ্ছে কোথায়!!!
মনগুলো সব দুমড়ে গেছে,
আছে হতাশা,
ডাক্তার-পুলিশ-নার্সেরা সব যোগায় যে আশা।
*আমরা কৃতজ্ঞ -তাদের কাছে যারা দিনরাত জেগে থাকা ডাক্তার-নার্স- স্বাস্থ্য কর্মী-পুলিশ- সমাজসেবী- সঙ্সার ছেড়ে-সন্তান ছেড়ে- আটঘন্টা।  পরিষেবা দিয়ে চলেছেন নিজেকে আস্টেপৃস্টে জড়িয়ে রাখা এক আবরন যার নাম "পিপিই"-Personal protective equipment"‌-তাদের লকডাউন মানার উপায় নেই। তারা সেবা নিবেদিত প্রাণ। তাদের কষ্ট লাঘব করার জন‍্যই আমাদের লকডাউন বাধ‍্যতামূলক।

আচ্ছা তুমি বলতো ভাই-
সর্দি কাশি আসতো নাই!!!
আমরা কেবল ভয় পাই-
ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নাই।
বাড়িতে থাকো-ভালো থেকো,
সব্বাইকে ভালো রেখো। 
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলো,
সবাইকে তাই বলো।
আমরা সব একসাথে,
গাইবো গান-
হঠাবো মোরা -ঘটাবো মোরা -করোণার অবসান।
প্রকৃতিতে এত ফুল-এত পাখি-এত গান,
জেগে থাকবে সব প্রাণ।
হেসে উঠবে তুমি-তোমরা- সবাই।
মারণ করোনা-নীরবে সায় দেবে-আর থেকে কাজ নাই।

মন মোর ভাঙে নাই,
শুধু ভাবি--কবে
সন্তান দুটো কাছে পাই।
বা আমি ওদের কাছে যাই।
আমার মতো বহু মাতা বহু পিতা -
রাত্রি যাপন করে, প্রহর গোনে- জাগো জাগো যন্ত্রমাতা।
ধৈর্য্য কেবল সহায় মোদের-
সহায় সাবধানতা,
মুছে যাক্ করোণার কালোছায়া- পাই শুভ বার্তা।

"লকডাউন একটি পদ্ধতি মাত্র"-ভালো থাকার-ভালো রাখার-ভালো থেকো সবাই- ভালো রেখো সবাইকেই- আগামী সমাজ রোগমুক্ত হোক্--- আমার-তোমার বন্দীদশায়-- লকডাউন--তোমার জয় হোক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ