নজরুল সাহিত্যে নারীঃ একটি নানাকৌণিক বিশ্লেষণ - এ কে আজাদ




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

নজরুল সাহিত্যে নারীঃ একটি নানাকৌণিক বিশ্লেষণ
এ কে আজাদ
************--***********-**************

বাংলাদেশের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তীতে কবির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
*************************************

“মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তুর্য” [বিদ্রোহী]

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে বিস্ময়কর এক অসাধারণ প্রতিভার নাম। তাঁর সাহিত্য সাধনা বাংলা সাহিত্যে আর দশজন কবির মত নয়। তিনি একেবারেই স্বতন্ত্র, একেবারেই আলাদা। তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য-ধারা কখনো উত্তাল সমুদ্রের তরঙ্গে ভীষণরূপে তরঙ্গায়িত, কখনো অগ্নিস্রাবী ভিসুভিয়াসের অগ্নি-উদগীরণে প্রমত্ত, কখনো মৃদু-মন্দ হিন্দোলে দোলায়িত। সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী কাব্য প্রতিভায় পরস্পর বিপরীত ধারার সংমিশ্রণ ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্ফুটনে নজরুল সাহিত্যে নারী দখল করে আছে যুগপৎভাবে এক বাস্তব ও বর্ণিল  স্থান। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে বাংলা সাহিত্য-গগণে কাজী নজরুল ইসলাম নামের যে প্রদীপ্ত সূর্য জীবনের সকল মাঠে আলো ছড়িয়েছিল তার একটি ব্যাপক অংশ জুড়েই ছিল নারী। প্রেম-বিরহ, সুখ-দুঃখ, হাসি-কাঁন্না, বিদ্রোহ-বিপ্লব জীবনের নানান পরতে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা নারী যেন সমান তালে বিজড়িত করেছে নজরুলের সাহিত্যকেও। ফলে নজরুলের কলমে একদিকে যেমন ঝঙ্কৃত হয়েছে বিদ্রোহের ঝনঝনানী, অপর দিকে নারীকে কেন্দ্র করে নজরুলের হাতে বেজে উঠেছে প্রেমের মোহন বাঁশী। কন্যা-জায়া-জননী রূপে মানব জীবনে নারীর অবস্থান যেমন অপরিহার্য, তেমনি নজরুলের সাহিত্যেও নারীর উপস্থিতি হয়ে উঠেছে অনিবার্য। মানব মনের মুকুরে প্রেয়সী হিসেবে নারীর ছবি যেমন প্রতিবিম্বিত হয়, তেমনি জীবনের মানোন্নয়নে এবং সমাজ বিপ্লবের জন্যও এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে নারী। বোধ করি, সে কারণেই যুগপৎভাবে বীর রস, করুণ রস ও প্রেম রসের প্রকাশে নারীকে দেখতে পাই নজরুলের বিচিত্র সাহিত্যের পাতায় পাতায়। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অপরাপর কবিদের হতে খানিকটা ভিন্নরূপে নারীর চিত্রায়ণ আমরা লক্ষ্য করি নজরুলের কাব্য মনীষায়। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানব মনে জগতের যে সুখ দুঃখ তা কেবল নারী-প্রেম কেন্দ্রিকই নয়, বাস্তব ও সংঘাতপূর্ণও বটে। নজরুলের ভাষায়ঃ-

প্রেমও আছে গুরু, যুদ্ধও আছে, বিশ্ব এমনই ঠাঁই,
ভালো নাহি লাগে, ভালো ছেলে হয়ে, ছেড়ে যাও মানা নাই।
আমি বলি- গুরু বলো তাহাদের কোন বাতায়ন ফাঁকে,
সজিনার ঠ্যাঙা সজনীর মত হাতছানী দিয়ে ডাকে।  [সর্বনাশের ঘন্টা]

এক সময়ে নারীকে মনে করা হত কেবল ভোগের সামগ্রী। নারীর লাঞ্চনা-বঞ্চনা ও গঞ্জনায় পুরুষ চিরকালই হাসাহাসি করে এসেছে। নারীর প্রেমে কবির হৃদয় রঙিন প্রজাপতির মত দখিনা হাওয়ায় উড়লেও, নারীর অপমানে কবি সাহিত্যিকগণ থেকেছেন নীরব। তার অবস্থার প্রতিকারের জন্য সোচ্চার দাবী করতে পারেননি কেউ। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলা সাহিত্যে নারী পুরুষের দুটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্ত্বা স্বীকৃতি লাভ করে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখের লেখায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেনঃ

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার/ কেন নাহি দিবে অধিকার, হে বিধাতা?
যাব না বাসর কক্ষে বধু বেশে বাজায়ে কিঙ্কিনি/আমারে প্রেমের বীর্যে করো অশঙ্কিনী। [সবলাঃ মহুয়া]

রবি ঠাকুর বিধাতার কাছে দাবী করলেন নারীর ভাগ্য জয় করবার অধিকার। অপরদিকে কাজী নজরুল ইসলাম নারীকে আহবান জানালেন ক্ষুদ্র গন্ডির সূতো ছিঁড়ে বের হয়ে আসার। তিনি বলেছেন – তার জন্য নিজেকেই জাগতে হবে সবার আগে। ‘মায়া মুকুর’ কবিতায় তাঁর ভাষায়ঃ

ভাঙ্গো ভাঙ্গো এই ক্ষুদ্রগন্ডি এই অজ্ঞান ভালো
তোমাতে জাগেন যে মহামানব, তাহারে জাগায়ে তোলো।

নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতা ও সমাজে নারীর মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে নারীর স্বজাতীয় জাগরণ সর্বাগ্রে প্রয়োজন। “আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে”। তাই তো ঈশ্বর কিংবা অন্য কারও করুণার দিকে না তাকিয়ে নারীদের নিজেদের জাগরণের প্রতি গুরুত্বারোপ করলেন নারীবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামঃ

জাগো নারী,  জাগো বহ্নি শিখা/ জাগো স্বাহা সীমান্তে রক্ত টিকা,
জাগো হতভাগিনী ধর্ষিতা নাগিনী/ বিশ্বদাহন তেজে জাগো দাহিকা।
ধূ ধূ জ্বলে ওঠো ধূমায়িত অগ্নি/ জাগো মাতা, কন্যা, বধূ, জায়া, ভগ্নি।

নারী জাগরণের এমন প্রত্যক্ষ আহবান বাংলা কবিতা বা গানে ইতোপূর্বে লক্ষ্য করা গেছে কিনা তা গবেষণার বিষয় বটে। 

সব অনাচার অবিচার মুখ বুঁজে নীরবে সয়ে যাওয়ার প্রবণতা নারীর ভেতরে যেন প্রবল। সইতে সইতে নারী যেন মাটির মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। কোন প্রতিবাদ নেই, কোন জাগরণ নেই, নেই কোন প্রাণের উদ্বোধন। এ যেন মূর্তিসম নিষ্প্রাণ মাটির ঢেলায় পরিণত হয়েছে নারী সমাজ। কিন্তু পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও তো জাগতে হবে। গাইতে হবে জীবনের জয়গান। ঘরে বাইরে সর্বত্র নারী পুরুষের সমান তালে জাগরণই কেবল অর্জন করতে পারে স্বাধীনতা, রুখে দিতে পারে সকল অনিয়ম-অনাচার, অত্যাচার-অবিচার। মাটির মূর্তির উপমায় নারীকে আহবান করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহ ও বিপ্লবের চেতনায় জাগ্রত হতে। সে জাগরণের অপেক্ষায় যেন অধীর হয়ে আছেন কবিঃ

আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি-আঁড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব শিশুদের মারছে চাবুক বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা আসবি কখন সর্বনাসী! [আনন্দময়ীর আগমেণে]।

কেন জাগবে না নারী? এই সমাজ সভ্যতার উন্নয়নে নারীর অবদান তো কম নয়? মানব সভ্যতার যে ইতিহাস তার পাতায় পাতায় লুকিয়ে আছে নারীর অবদান। তাই তো কবির চোখে পুরুষ নারীর ভেদাভেদ নেই। ‘নারী’ কবিতায় তিনি লিখেছেনঃ

সাম্যের গান গাই/ আমার চক্ষে পুরুষ রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।
-------------
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।
-----------------
এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল ফলিয়াছে যত ফল
নারী দিলো তাতে রূপ রস গন্ধ সুনির্মল।
----------------
দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস, নিশীথে হয়েছে বধূ,
পুরুষ এসেছে মরু-তৃষা লয়ে নারী যোগায়েছে মধু।
-------------------
নর বাহে হল নারী বহে জল, সেই জল মাটি মিশে
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষে।
---------------
নর দিলো ক্ষুধা নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে
জন্ম লভিছে মহামানবের মহা শিশু তিলে তিলে।
---------------
কোন কালে একা হয়নি ‘ক জয়ী পুরুষের তরবারী
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।

এত অবদান স্বত্বেও নারী সারা জীবনই রয়েছে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। পুরুষ-শাসিত সমাজ কোন কালেই স্বীকার করেনি নারীর ঔদার্য। পুরুষের রক্ত দানের ইতহাস রচিত হলেও সে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই মিলেনি নারীর অশ্রু জলের। মায়ের হৃদয় ভাঙ্গা ক্রন্দনধ্বনি মিশে গেছে বাতাসের অদৃশ্যমানতায়। বোনের সেবার সে উদার হাতের পরশ মিশে গেছে বিজয়ের হর্ষধ্বনির উচ্ছ্বলতায়। নজরুল লিখেছেনঃ

জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান,
মাতা, ভগ্নি ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।
কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে,
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর লেখা নাই তারই পাশে।
কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি, কত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতি স্তম্ভের পাশে লিখিয়া রেখেছে কে বা?  [নারী]

কিন্তু তাই বলে নীরবে সব ব্যাথা-অপমান সয়ে যাবে কি নারী? কোন কিছুই কি বলার নেই? কোন কিছুই কি করার নেই?  না, এমনটি তো হতে পারে না। আজ রুখে দাঁড়াতে হবে নারীকে। ভীরুতাকে পায়ে দলে শিখতে হবে সাহসের সমাচার। আদায় করতে হবে নিজেদের অধিকার, যে চুড়ির শিকলে আজ বাঁধা পড়েছে নারী, সে শিকল ভাঙ্গতে পারলেই, ভাঙ্গা চুড়ির রিনিঝিনিই দেখাবে একদিন পথের দিশা। তার জন্য চাই শক্তি,  চাই সাহস, চাই সংকল্প। নজরুলের ভাষায়ঃ

আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যকুলতা!
আজ তুমি ভীরু, আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা।
চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না,  হাতে রুলি পায়ে মল,
মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙ্গে ফেল ও শিকল।
যে ঘোমটা তোমা’করিয়াছে ভীরু ওড়াও সে আবরণ,
দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন ঐ যত আভরণ।
-------------------------------
ভেঙ্গে যমপুরী নাগিনীর মত আয় মা পাতাল ফুঁড়ি,
আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারই ভগ্ন চুড়ি।
---------------------------------
সেদিন সুদূরে নয়,
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়। [নারী]

তবে এখানে একটি কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য যে, নজরুলের কাব্যে যে নারীবাদিতা পরিলক্ষিত হয়, তা বর্তমান কালের নারীবাদী মনোভাব থেকে দর্শনগতভাবে ভিন্ন। এখন যারা নারীবাদিতার কথা বলেন, নিছক অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্যই নিজেদেরকে নারীবাদী নারীবাদী বলে গলা ফাটান কি না তা একবার ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ আছে বলেই অনেকেই সমালোচনা করেন। তারা নারীবাদিতার ছলে কোন এক বিকৃত সংস্কৃতিরই উপস্থাপন করতে চান কি না তাও স্পষ্ট নয় বলেই অনেকের ধারণা। পুরুষের বিপরীতে তারা নারীকে মুখোমুখী দাঁড় করাতে চান কি না সে ব্যাপারেও প্রশ্ন তুলেন অনেকেই। যাকগে, ও তর্কের দরকার  আমাদের নেই। আমরা শুধু জানি - আবহমান মানব সভ্যতার ইতিহাসে নারী ব্যতীত পুরুষ এবং পুরুষ ব্যতীত নারী কোনটিই গ্রহণযোগ্য, যুক্তিযুক্ত, বাস্তবসম্মত এবং সম্ভবপর নয়। আর আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সে কথাটিই বুঝাতে চেয়েছেন তাঁর অমর সৃষ্টি কাব্য ও গানে। তাঁর সাহিত্যাঙ্গনে নারী ও পুরুষ একে অপরের সহযোগী, একে অপরের পরিপূরক, একজনকে ভিন্ন আরেকজন চলে না, তবে নারীর নিগৃহিত অবস্থা কোন ভাবেই কাম্য নয়, বাঞ্চনীয় নয় এবং গ্রাহ্যও নয়।

নারী জাগরণের আহবানের পাশাপাশি নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ভালবাসাও বর্ণিত হয়েছে কাজী নজরুলের শিল্পীত সাহিত্যের অঙ্গনে। তাঁর মতে নারী পুরুষের প্রতিযোগি নয়, সহযোগী। দু’জনের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই মানব সভ্যতা এগিয়ে চলেছে উৎকর্ষকতার দিকে। সে কারণেই তাঁর চোখে পুরুষ রমণীর কোন ভেদাভেদ নেই। আর যারা নারীকে হেয় করতে চায়, তাদের ব্যপারে নজরুলের দ্বিধাহীন উচ্চারণঃ

নরক কুন্ড বলিয়া কে তোমা করে নারী হেয় জ্ঞান,
তারে বল - আদি পাপ নারী নহে, সে যে নর শয়তান। [নারী]

নারীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে কোন বাছবিচার করেননি কবি। বরং নারীরা যদি তাদের পাপের কারণে কিংবা অনাচারের কারণে কোথাও অপমানিত হয়, তার জন্য পুরুষও কম দায়ী নয়। তাহলে শুধু নারীকেও দায়ী করা কেন? নারীকেই দাঁড়াতে হবে কেন বিচারের কাঠগড়ায়? এমনকি যারা পতিতা, তাদেরকে একপেশে ভাবে সমাজে কেন লাঞ্চিত হতে হবে? এক্ষেত্রে পুরুষরা কম দায়ী কিসে? বরং পুরুষই বেশী দায়ী। যদি পুরুষ পতিতালয়ে না যায়, তাহলে পতিতালয় তো চলতে পারবে না। কেবল পুরুষের কামনা বাসনা পূরণ করার জন্যই তো নারীরা হয় পতিতা। যারা পুরুষকে তৃপ্ত করে দেহের পসরায়, তারা পতিতা বলে সমাজে অপমানিত হয়,  কদর্য বলে অস্পৃশ্য হয়, অথচ যে পুরুষ নারীর দেহে নিজের কামনা চরিতার্থ করে যৌবন জোয়ারে ভাসিয়ে দেয় খেয়ালী মনের সাম্পান, তাদেরকে সমাজ সমাজচ্যুত করে না, তাদেরকে লাঞ্চিত হতে হয় না। যে নারী পতিতা হয় সে হয়তো অর্থের প্রয়োজনে কিংবা জীবন বাঁচানোর তাগিদেই পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করে। অথচ যে পুরুষ পতিতার কাছে যায়, দৈহিক কামনা পূরণ করে, সে কেবল খেয়ালী মনের বাসনাই পূরণ করে, তাহলে নারীকেই কেবল লাঞ্চিত হতে হবে কেন? চরিত্রহীন, লম্পট পুরুষ কেন লাঞ্চিত হবে না? কেন অপমানিত হবে না? তাই তো নারীর পাশে দাঁড়িয়েছেন মানবতাবাদী সমাজ সচেতন কবি। তিনি লিখেছেন ‘বারাঙ্গনা’ কবিতা, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন এক দিকের উন্মোচন করেঃ

কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও গায়?
হয়তো তোমারে স্তন্য দিয়াছে সীতাসম সতী মায়।
নাই হলে সতী, তবুও তোমরা মাতা-ভগ্নিরই জাতি,
তোমাদের ছেলে আমাদেরই মতো, আমাদেরই জ্ঞাতি।
আমাদেরই মতো খ্যাতি যশ মান তারাও লভিতে পারে
তাহাদের সাধনা হানা দিতে পারে সদর স্বর্গ-দ্বারে।
স্বর্গবেশ্যা ঘৃতাচী-পুত্র হল মহানবী দ্রোণ
কুমারীর ছেলে বিশ্ব-পূজ্য কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ।
-----------------
মুনি হল শুনি সত্যকাম সে জারজ জবলা শিশু,
বিষ্ময়কর জন্ম যাঁহার মহাপ্রেমিক সে যিশু!
-----------
পাপ করিয়াছি বলিয়া কি নাই পুণ্যের অধিকার?
শত পাপ করি’ হয়নি ক্ষুন্ন দেবত্ব দেবতার।
অহল্যা যদি মুক্তি লভে, মা-মেরী হতে পারে দেবী,
তোমরাও কেন হবেনা পূজ্যা বিমল সত্য সেবি’?
সেরেফ পশুর ক্ষুধা নিয়ে হেথা মিলে নর নারী যত,
সেই কামনার সন্তান মোরা! তবুও গর্ব কত!
শুন ধর্মের চাঁই-
জারজ কামজ সন্তানে দেখি কোন সে প্রভেদ নাই।
অসতী মাতার পুত্র সে যদি জারজ পুত্র হয়,
অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ সুনিশ্চয়!

সমাজ যাদেরকে অস্পৃশ্য বলে ঘৃণা করে, তাদেরকে তিনি মা বলে সম্বোধন করেছেন। এভাবেই কাজী সাহেব যুগপৎভাবে নারীর প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন এবং পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও করতে চেয়েছেন সমাজ বদলের অন্যতম অনুঘটক। কেননা পুরুষকে জাগাবার জন্য নারীরা পালন করতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জনৈক শামসুন নাহারের কাছে ১১/০৮/১৯২৬ তারিখে লিখিত একটা পত্রে তিনি বলেছিলেন- “আমাদের দেশের মেয়েরা বড় হতভাগিনী। কত মেয়েকে দেখলাম কত প্রতিভা নিয়ে জন্মাতে, কিন্তু সব সম্ভাবনা তাদের শুকিয়ে গেল সমাজের প্রয়োজনীয় দাবীতে। তাই নারীদের বিদ্রোহিনী হতে বলি”। এমনি করে নারীদের মধ্যে তেজদীপ্তি যেমন দেখতে পেয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, তেমনি দেখতে পেয়েছিলেন অদুদর্মনীয় এক বহ্নিশিখা, যা ঘুমন্ত পুরুষদেরকে জাগাতে সক্ষম, যা ভীত কাপুরুষদের মাঝে জাগিয়ে তুলতে পারে পৌরষত্ব, এমন আশা থেকেই বোধ করি নজরুলের কন্ঠে সুরলহরী লাভ করেছে নারী সাহসের জয় বন্দনাঃ

আমি মহাভারতী শক্তি নারী
.........................
(আমি)শান্ত উদাসীন মেঘে আনি বর্ষণ বেগ
আমি তড়িৎ লতা,
পরাজিত পৌরুষে জাগায়ে তুলি
দূর করি নিরাশা দূর্বলতা।

নারী জাগরণ, নারী অধিকার, নারীর প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন নজরুলের কবিতা ও গানকে যেমন আলোড়িত করেছে, তেমনি নারী পুরুষের প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা, ভাল লাগা, মান অভিমান, খুনসুটিও লাভ করেছে অমর বাণী। বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য রোমান্টিক কবির মত নজরুলও বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন বিধাতার অপরূপ সৃষ্টি নারীর প্রতিঃ

তুমি সুন্দর, তাই চেয়ে থাকি/ প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ?
চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরিনী/ বলে না তো কিছু চাঁদ।

নারীর সৌন্দর্যের প্রতি নজরুলের যে দুর্নিবার আকর্ষণ, মানব সত্ত্বার গভীরতম স্তরে তার বসবাস। এ বন্ধন দুচ্ছেদ্য, দুর্মর, চিরকালীন। হৃদয়ের এ টান যেন অনুভব করেছিলেন পৃথিবীর আদি মানব আদম (আঃ) পৃথিবীর প্রথমা নারী তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী হাওয়া (আঃ) এর প্রতি। ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি জন মিলটন তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’ বুক-নাইন এ বাবা আদমের সে অভিব্যক্তি তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে। এ অভিব্যক্তি যেন কেবল বাবা আদমের নয়, মিলটনের নয়, নজরুলের নয়, এ যেন সকল পুরুষের, সকল মানবের।
তিনি লিখেছেনঃ
O! Fairest of creation! last and best/ Of all God’s works.
How can I live without thee?
 [হে সুন্দরতম সৃষ্টি, সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ, ঈশ্বরের সৃষ্টি মাঝে/ আমি কি করে বাঁচিতে পারি বল তোমায় ছাড়া?]

নজরুলের প্রেম নিবেদন বিংশ শতকের অপরাপর কবিদের থেকে বেশ খানিকটা ভিন্ন। এক্ষেত্রে একটা আলাদা পথ তৈরী করে নিয়েছিলেন নজরুল।

পুরুষের আপ্লুত হৃদয়ে যে প্রেম নদীর ঢেউয়ের মতো ছলাৎছল করে উথলে উঠে, সে প্রেম তার প্রেয়সীর মনে স্থান পাবে কি পাবে না, তা নিয়ে যেন সংশয় অনেকের মনে। খানিকটা দ্বিধায়, খানিকা লাজে মনটা যেন জড়াগ্রস্থ থাকে। অথচ প্রেমের কবি নজরুল গাইলেন- ভুলতে চাইলেও তাঁর প্রেয়সীকে ভুলতে দেবেন না তিনিঃ

আমি চির তরে দূরে চলে যাব/ তবু আমারে দেবনা ভুলিতে,
আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশ/ বেণী যাবে যবে খুলিতে
তোমার সুরের নেশায় যখন/ ঝিমাবে আকাশ কাঁদিবে পবন
রোদন হইয়া আসিব তখন/ তোমার বক্ষে দুলিতে।

তাঁর সমসাময়িক আরেকজন রোমান্টিক কবি জীবনানন্দ যখন তাঁর প্রেয়সীর কাছে খুঁজে পেলেন দু’দন্ড শান্তি। তখন তিনি বিস্ময়ে বলে উঠলেন- “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা”।

একটা রহস্যময়তা যেন জীবনানন্দের প্রেয়সীর কেশে। অপর পক্ষে প্রেয়সীর কেশের গন্ধে ব্যকুল হয়ে উঠলো নজরুলের উচাটন মন। কবির হৃদয় ফেঁসে গেলো প্রেয়সীর খোঁপার বাঁধনে। প্রেয়সীর প্রেমে তিনি যেন অন্ধ। কবির অন্ধ প্রেম যেন শক্ত-পোক্ত হয়ে এঁটে যায় প্রেয়সীর চুল বাঁধা জরিন ফিতায়। তাই তো প্রেয়সীর কাছে কবির নিবেদনঃ

আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন/ দিল ওহি মেরা ফাস গায়ি,
বিনোদ বেণীর জরিন ফিতায়/ আন্ধা ইশ্ক্ মেরা কাস্ গায়ি।
তোমার কেশের গন্ধে কখন/ লুকায় আসিলো লোভী আমার মন
বেহুঁশ হো কার গিরপারি হাথো ম্যায়/ বাজু বান্ধ ম্যায় বাস গায়ি।

আত্মনিবেদন ও প্রশান্তি নজরুলের প্রেমের কবিতায় নেই। নজরুলের প্রেমাঙ্খা সাধারণ মানুষের পর্যায়ের। তিনি নারীকে শ্রদ্ধা করেছেন, তার সম্মান অধিকার দাবী করেছেন। এমনকি বারাঙ্গনাকে মা বলে ডেকে তাকে মাতৃত্বের সম্মান দিতেও কুন্ঠা বোধ করেননি তিনি। জীবন ও সাহিত্যে নজরুলের কোন বিরোধ নেই। তাঁর কাছে জীবনই সাহিত্য, সাহিত্যই জীবন। তিনি স্বীকারও করেছেন সে কথাঃ 

বড় কথা বড় ভাব আসে না মাথায় বন্ধু বড় দুখে
অমর কাব্য তোমরা লিখিও বন্ধু যাহারা আছ সুখে। [আমার কৈফিয়ত।]

যাহোক নারীর প্রেমে নজরুলও বড় কোমল হয়ে উঠেছেন। কখনো বিগলিত হৃদয়ের ভাষা বাণী লাভ করেছে তাঁর কবিতার পয়ারেঃ

আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনী/ ছল করে দেখা অনুক্ষণ
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা/ তার কাঁকন চুড়ির কঙ্কন।
আমি চির শিশু, চির কিশোর
আমি যৌবন ভীতু পল্লী বালার আঁচর কাঁচুলী নিচোর। [বিদ্রোহী]

কখনো নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেছেন কবি তাঁর প্রিয়ার কাছে, কখনো প্রেয়সীকে সাজিয়েছেন তারার ফুলে, কখনো বিদ্রোহী কবির উচ্চ শির প্রিয়ার কোলে রেখে হয়েছেন ধন্য। চির দ্রোহী অন্তর তাঁর প্রশান্ত সমাপ্তিতে হয়েছে আনন্দে ভরপুরঃ

হে মোর রানী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে
আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণ তলে এসে। [বিজয়িনী]

প্রিয়ার মলিন বসনে সে যেন কবির কাছে হয়ে উঠেছে আরও আদরিনীঃ

তুমি মলিন বাসে যখন থাক সবার চেয়ে মানায়!
তুমি আমার তরে ভিখারিনী সেই কথা সে জানায়।
---------------------
দেবী! তুমি সতী অন্নপূর্ণা, নিখিল তোমার ঋণী,
শুধু ভিখারীকে ভালোবেসে সাজলে ভিখারিনী। [সাধের ভিখারিনী]

বেদনাক্লিষ্ট প্রেয়সীর গহনা-গাটিহীন দেহাবয়ব কবির কাছে হয়ে উঠেছে সোনা। প্রেয়সীর সান্নিধ্যে আপ্লুত কবি। শান্তনার বাণী তাঁর লাভ করে ছন্দের হিমালয়, প্রেয়সীর মলিন দেহ কবির কাছে হয়ে উঠে সোনার মত দামী। প্রেয়সীর ব্যথায় ব্যথিত কবির অন্তরে আঁকা হয় আবেগের আল্পনা। বলে ওঠেন কবি-

নয়ন ভরা জল গো তোমার/ আঁচল ভরা ফুল,
আমি জল নেব না ফুল নেব/ ভেবে হই আকুল।
কিংবা
আমি জানি তুমি কেন যে নিরাভরণা,
ব্যথার পরশে হয়েছে তোমার সকল অঙ্গ সোনা। [ভীরু]

প্রিয়ার ভালোবাসার দানে কবি হয়েছেন সিক্ত। ভালোবাসার জোয়ারে কবির হৃদয় ভেসে গেছে অজানার পানে। বিচিত্র রূপিনী রমণীর প্রেমের আগুনে পুড়তে পুড়তে কবি নিজেই যেন হয়ে উঠেছেন নিখাদ সোনা। পরিপূর্ণ ভালোবাসার দানে মুগ্ধ নজরুল ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠেছেন কবি। কবির সে রূপ কেবল মনেই নয়, বহিরাবরণেও। তাই তাঁর স্বীকারোক্তিঃ

তুমি আমায় ভালোবাস তাই তো আমি কবি,
আমার এ রূপ সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি। [কবি রানি]

‘নারী’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-

নারীর বিরহে নারীর মিলনে নর পেল কবি প্রাণ,
যত কথা তার হইলো কবিতা, শব্দ হইল গান।

হ্যাঁ,তিনি কবি হতে পেরেছেন, না না তিনি কবি হয়েই জন্মেছিলেন। তাই তো তিনি অনায়াসেই বুঝতে পারতেন মানুষের মনের ভাষা, বুঝতে পারতেন মানুষের চোখের ভাষা। প্রেয়সীর চোখের পাতায় পড়তে পারতেন হৃদয়ের কোণে লুকিয়ে থাকা কথামালা। শুধু তাই নয়, ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডস্ ওয়ার্থের মত প্রকৃতির মাঝে তিনিও খুঁজে পেয়েছেন প্রেয়সীর মুখ, তার চোখ, চোখের কাজল রেখা। প্রেমিক চোখে বৃক্ষের পাতার ফাঁকে খুঁজে পেয়েছেন প্রেয়সীর অনুপম অঙ্গের ভাঁজ। নদীর ঢেউয়ের মাঝে আবিষ্কার করেছেন প্রেয়সীর অশ্রুমতী চোখ। নিজের স্পর্শকাতর অনুভূতির ছান্দসিক প্রকাশ কবির কবিতায়ঃ

তোমার পাতায় দেখেছি তাহারি আঁখির কাজল রেখা,
তোমার দেহের মতন দীঘল তাহার দেহের রেখা। [বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি]
কিংবা
তুমি কি পদ্মা, হারানো গোমতী, ভুলে যাওয়া ভাগিরথী,
তুমি কি আমার বুকের তলায় প্রেয়সী অশ্রুমতী?  [কর্ণফুলী]

নজরুলের কাব্যে কেবলই নারী কল্পনা কিংবা নারী পুরুষের আদি সম্পর্কের বিষয়ই স্থান পায়নি, তাঁর কবিতায় প্রেমিকের জন্য নারী হৃদয়ের চিরন্তন ব্যাকুলতাও করে নিয়েছে নিজের স্থান। দেশ কাল পাত্র ভেদে প্রেমিকের সফলতা কিংবা তাঁর বিজয়ের জন্য নারী হৃদয়ের শুভ কামনা চিত্রিত হয়েছে খালেদ কবিতায়ঃ

খর্জুর বিথী আজিও ওড়ায় তোমার জয় ধ্বজা,
তোমার আশায় বেদুঈন বালা আজিও রাখিছে রোজা।

অপর পক্ষে প্রিয়জনের পরাজয়ে কিংবা প্রিয় বিয়োগের বেদনায় নারীর ব্যথাতুর হৃদয় মাঝে বেজে ওঠে বেহাগের সুর। চিরকালের নারী হৃদয়ের এমন আকুতির প্রতিচ্ছবি কবি নজরুলের কবিতায়ঃ

মা ফাতেমা আসমানে কাঁদে খুলি কেশ পাশ,
বেটাদের লাশ নিয়ে, বধূদের শ্বেতবাস।
রণে যায় কাসিম ঐ দু’ঘড়ির নওশা
মেহেদীর রংটুকু মুছে গেল সহসা।
হায়! হায়! কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা,
কঙ্কন পঁইচি খুলে ফেলে সখিনা। [মোহররম]

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন নবুওয়াত লাভ করেন, সে সময় যিনি প্রথম মুসলমান হিসেবে কালেমা পড়েছিলেন, তিনি হলেন মহানবীর প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদিজা (রাঃ)। তিনি নিজের ধন সম্পদ সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে স্বামীর আদর্শ বাস্তবায়নের এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে নিজের নাম ইতহাসের পাতায় লিখিয়েছেন স্বর্ণাক্ষরে। পুরুষের বিজয়ের পেছনে নারীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাই তো নজরুলের কন্ঠে মহিয়ষী নারী খাদিজার বন্দনা তাঁর ‘মরু ভাস্কর’ কবিতার পয়ারেঃ

সাধ্বী পতিব্রতা খাদিজাও কহেন স্বামীর সনে,
দূর কর ঐ লাত মানাতেরে পূজে যাহা সব জনে।
তব শুভ বরে একেশ্বর সে জ্যোতির্ময়ের দিশা,
পাইয়াছি প্রভু কাটিয়া গিয়াছে আমার আঁধার নিশা।

অর্থাৎ নজরুল সাহিত্যে যে নারীকে উপস্থাপন করা হয়েছে সে নারী অবলা নয়, অচল-অথর্ব নয়, সে নারী জ্ঞানী, সে নারী গুনী, সে নারী প্রতিবাদী, সে নারী বিদ্রোহী, সে নারী নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার, সে নারী পুরুষের সহযোগী, উন্নয়নের নিত্য সঙ্গী, সভ্যতার সত্যাগ্নি আলোক বর্তিকা।  শুধু তাই নয় জগতের যে মঙ্গল, পৃথিবীর যে পরিত্রাণ, মানুষের যে মুক্তি, তার সূতিকাগারাও যেন নারী। নারী কেবল ভোগের সামগ্রী নয়, নারী কেবল ললনা নয়, এই নারীর বুকেই মানব জনম ও বেড়ে ওঠার বীজ লুকায়িত। আবার নারীই মানব সভ্যতার বিকাশে প্রথম পিলসুজ। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বিকশিত হওয়ার যে আলোক রশ্মি, তারও উত্তরণ এবং উৎসরণ যেন নারীর কোলেইঃ

তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে,
যেন ঊষার কোলে রাঙ্গা রবি দোলে।
কিংবা
সাহারার বুকে মাগো তুমি মেঘ মায়া,
তপ্ত মরুর বুকে স্নেহ তরু ছায়া।

এক দিকে যেমন প্রেয়সী বলে নারীর গলা জড়িয়ে ধরেছেন নজরুল, আনন্দে হয়েছেন গদগদ, তেমনি খুশির ছলকে ছলকে প্রেয়সীর খোঁপায় পরাতে চেয়েছেন তারার ফুল; তার কানে দোলাতে চেয়েছেন ‘তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল’। আবার মা বলে লুটিয়ে পড়েছেন নারীর পায়ে। নারীকে কল্পনা করেছেন তার কাঙ্খিত বিপ্লবের প্রেরণাসঙ্গী হিসেবে। আবার নারীকে কেন্দ্র করে মান অভিমানও কম নেই নজরুলের কাব্য ছন্দের দ্যোতনায়। নারীকে যেমন ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছেন, শ্রদ্ধায় মাথায় তুলে নিয়েছেন, তেমনি আবার ফুল তুলতে গিয়ে কেঁদেছেন কাঁটার আঘাতে। নারীর বিশ্বাসঘাতকতায় বেদনায় হয়েছেন মুহ্যমান। অভিযোগের তীরে নারীকে করেছেন বিদ্ধ। নারীর কাছে পুরুষের চিরন্তন আবেদনময় ভঙ্গিতে নজরুল বলেছেন-

প্রিয়া হয়ে এলে প্রেমে, বধূ হয়ে এলে না অধরে
দ্রাক্ষা বুকে রহিলে গোপনে তুমি শিরীন শরাব
পেয়ালায় নাহি এলে। [অনামিকা]

নারীকে কাছে না পাওয়ার বেদনায় বিষিয়ে ওঠে প্রেমিকের মন। আশাহত হৃদয়ের কোণে বেজে ওঠে ব্যথাতুর বীণ। আগুনে কখনো হৃদয় পুড়ে হয় ছারখার। মনের অজান্তেই ভালোবাসা হয়ে ওঠে অভিশাপের কালবৈশাখীঃ

গাইতে বসে কন্ঠ ছিঁড়ে আসবে যখন কান্না
বলবে সবাই- সেই যে পথিক, তার শেখানো গান না!
...................
আসবে আবার আশিন হাওয়া শিশির ছেঁচা রাত্রি,
থাকবে সবাই, থাকবে না এই মরণ পথের যাত্রী।
...........................
তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা বন্ধ,
আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়তো হবে অন্ধ।
সখার কারা বন্ধ।
আসবে ঝড়, নাচবে তুফান, টুটবে সকল বন্ধন
কাঁপবে কুটির সেদিন এসে, জাগবে বুকে ক্রন্দন
টুটবে যবে বন্ধন।   [অভিশাপ]

আবার কোন নারীকে ফিরিয়ে দিয়েও স্বস্তি পায় না প্রেমিকের অন্তর। সে অন্তর্দাহনও ভাষা লাভ করেছে কাজী নজরুলের কবিতার পয়ারেঃ

অনেক করে বাসতে ভালো পারিনি মা তখন যারে
আজ অবেলায় তারেই মনে পড়ছে কেন বারে বারে।
...................
জল ঝরেছে, তখনো মা কইনি কথা অহংকারে
এমনি দারুন হতাদরে করেছি মা বিদায় তারে।
.................
ও কে দুয়ার খোলে
দুয়ার ওমা? ঝড় বুঝি মা তারই মত ধাক্কা মারে?
ঝোড়ো হাওয়া। ঝোড়ো হাওয়া, বন্ধু তোমার সাগর পারে। [অবেলার ডাক]

কাউকে বিদায় দিলেও যেমন সে ঝড় হয়ে এসে বুকের মাঝে ধাক্কা মারে, কারও অপমানে কিংবা কারও দ্বারা প্রতারিত হলেও তেমনি বুকের মাঝে রক্ত ঝরে। ব্যথার আগুনে হৃদয় পুড়ে। পুড়তে পুড়তে খাঁটি সোনা হয় মানুষের বুকের জমীন। সে জমীনে বাস করেন ‘সত্য ভগবান’ঃ

মোর বুকে জাগিছেন অহরহ সত্য ভগবান,
তাঁর দৃষ্টি বড় তীক্ষ্ম, এ দৃষ্টি যাহারে দেখে
তন্ন তন্ন করে খোঁজে দেখে তার প্রাণ।  [পূজারিনী]

জীবন জগতকে কবি দেখেছেন ‘সত্য ভগবান’ রূপে। ফলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গড়ে উঠেছে তাঁর জীবন দর্শন। নারীকে কেন্দ্র করে অনেক কবিই কবিতা লিখেছেন। তুলে ধরেছেন নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি। কাজী নজরুল ইসলামও কম কিসে? নারীর দক্ষতা যোগ্যতা ও মাতৃত্ব শক্তির প্রশংসায় যেমন পঞ্চমুখ হয়েছেন কবি, তেমনি আবার নারীর ছলনাকে করেছেন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য। লালায়িত ললনার ছলনাকে এক হাত দেখাতেও ছাড়েননি তিনি। তিনি লিখেছেনঃ

এ যে সেই চিরপরিচিত অবহেলা/ এ যে সেই চির ভাবহীন মুখ
পূর্ণা নয়, এ যে সেই প্রাণ নিয়ে ফাঁকি/ অপমানে ফেটে যায় বুক।
প্রাণ নিয়া এ কি দারুন খেলা খেলে এরা হায়,
রক্ত ঝরা রাঙা বুক দলে অলক্তক পরে এরা পায়।
এরা দেবী, এরা লোভী, এরা চাহে সর্বজন প্রীতি,
ইহাদের তরে নহে প্রেমিকের পূর্ণ পূজা, পূজারীর পূর্ণ সমর্পণ,
পুজা হেরি ইহাদের ভীরু বুকে তাই জাগে এত সত্যভীতি।
নারী নাহি হতে চায় শুধু একা কারো,
এরা দেবী এরা লোভী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরো
ইহাদের অতি লোভী মন/একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়/যাচে বহুজন। [পূজারিনী]

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এ কথাই প্রতীয়মান বলে মনে হয় যে, নজরুল-সাহিত্যে কঠোরতা ও কোমলতার এক চমৎকার সম্মিলন ঘটেছে। এই বৈপরীত্যের মাঝখানে এসে তাঁর সৃষ্ট নারী সাহিত্যাঙ্গণে অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। নজরুলের নারী কোথাও হৃদয় রাজে ঐশ্বর্যমন্ডিত মহাশক্তিধর একক সম্রাজ্ঞী, কোথাও প্রেম বিরহের সম্মিলনে সুখ দুঃখের প্রিয়া, কোথাও কিশোরী সলাজ বধু, কোথাও মমতাময়ী মা, কোথাও বিদ্রোহ-বিপ্লবের সাহসী সঙ্গীনী, কোথাও প্রথম পরশের কম্পিত কুমারী, আবার কোথাও হৃদয়হীনা, অীবশ্বাসী এক নিষ্ঠুর প্রেমিকা। তবে তাঁর সৃষ্ট নারী দর্শনের ভারে নুব্জ নয়, কিংবা বাহুল্য চিত্রণে অস্বাভাবিক চরিত্রও নয়।
নজরুল সাহিত্যে নারী যা তা-ই। কল্পলোকের অতিমানবী নয়, আবার লাঞ্চনা, গঞ্জনার যাঁতাকলে পিষ্ঠ অস্পৃশ্য কোন জীবও নয়। নজরুলের সিক্ত হৃদয়ের জলাভূমিতেই নারী-প্রেম ও নারী-ভক্তির জন্ম ও বেড়ে ওঠা। নারী হৃদয়ের ভালোবাসা কেবলই কুহেলিকা নয়, আলেয়া নয়; এ আলোও ছড়ায়। যদিও নজরুল নিজেই তার ‘ব্যাথার দান’-এ বলেছিলেন- ‘দুনিয়ার সবচেয়ে মস্ত হেয়ালী হচ্ছে মেয়েদের মন’। তার পরেও নজরুল কেবলই যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে নারীকে বিবেচনা করেননি, অবুঝ হৃদয়ের সবুজ ভালোবাসার জন্যও নারীকে তিনি ভাসিয়েছেন উত্তাল যমুনার জলে ভেসে চলা রঙিন সাম্পানে। তাঁর সৃষ্ট নারীতে আবেগ আছে, ভালবাসা আছে, কান্না আছে, বীরত্বের সাহস আছে, বঞ্চনার জ্বালা আছে, ঈর্ষা আছে, হিংসা-প্রতিহিংসা আছে, আছে ঘাত-প্রতিঘাত। নজরুল সাহিত্যের নারী কেবলই হৃদয় সর্বস্ব নয়, দেহের পসরা আছে, প্রকৃতির ব্যঞ্জনা আছে, আছে স্বপ্নের বিভোরতা। দোষগুণে এক স্বাভাবিক নারীই নজরুল সাহিত্যের উপাদান। সমাজ সচেতন কবি নজরুল ইসলাম যখন নারীর আঁচলে ধরা পড়েছেন তখন হয়ে উঠেছেন চরম ভাবপ্রবণ, আবার যখন নারীর বিরহে বেদনাক্লিষ্ট হয়েছেন, তখন নারীকে করেছেন অভিশাপের বাণীতে জর্জড়িত। তাঁর নারী সুন্দরী প্রেমিকা, তাঁর নারী মা, আবার কখনো লোভী, ছলনাময়ী। প্রকৃতপক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম একজন স্বাভাবিক ও সামাজিক নারীর চরিত্রই চিত্রায়ন করেছেন তাঁর অমর সাহিত্যে। নজরুল শিখিয়েছেন প্রেম ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও ভক্তি। আমরা যখন নারীর প্রেমে পড়ব, তখনও আমাদের যেতে হবে নজরুলের কাছে। যখন নারীর বিরহে কাতর হব, তখনও আমাদের ফিরে যেতে হবে নজরুলের কাছে। আমরা যখন নারী জাগরণের কথা বলব, তখনও যেতে হবে নজরুলের কাছে। আবার যখন নারীর বিজয়ে উল্লাস করব, উৎসব করব, তখনও আমাদের ফিরে যেতে হবে নজরুলের কাছে। নজরুল সাহিত্যে নারীর চিত্রায়ণ এমনই চমকপ্রদ। #

[লেখকঃ এ কে আজাদ; কবি, গীতিকার ও প্রাবন্ধিক। বগুড়া, বাংলাদেশ। দূরালাপনী- +৮৮০ ১৬১২ ৪৩ ১৩ ০৩  ইমেইলঃ akazadkobi@gmail.com ]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ

  1. বাহ্ অপূর্ব !নজরুল ইসলামের ভিন্ন আঙ্গিকে এভাবে নারী কে নিয়ে বিশ্লেষণ
    আর তোর অপূর্ব উপস্থাপন .... মন ভরে গেলো সাথে নিজেকে আরও একটু সমৃদ্ধ করলাম 👍😊

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ
    যত তোমার লেখা পড়ছি শুধুই মুগ্ধ হচ্ছি

    উত্তরমুছুন
  3. বাঃ।
    তবে বিশাল বড় ।। সময় ও ধৈর্যশীল হতে হবে পাঠে।

    উত্তরমুছুন