সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এর 'আমরা' কবিতায় বাঙালির গৌরবগাঁথা | অলিপা পাল




পোস্ট বার দেখা হয়েছে
                                 অঙ্কন : দেবপমা চন্দ


 "ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে "

(সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এর 'আমরা' কবিতায় বাঙালির গৌরবগাঁথা)

অলিপা পাল 


স্রোতস্বিনী মুক্তধারা গঙ্গার  ছোঁয়ায় পবিত্র বাংলায় বাঙালির বাস ৷ফুল ফল ফসলের অপরূপ শোভায়  শোভিত বাঙালির বাসভূমি ৷বাংলা মা লক্ষ্মীরূপে বিরাজিত ৷তাঁর কপালের সূর্যের আলোতে মাথার হিমালয়ের মুকুটের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবী ময় ৷ তাঁর পায়ে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে প্রণাম জানায় ৷আমরা বাঙালি সেই পবিত্র বঙ্গে বাস করি ৷ সুন্দর বনের মানুষের বাঘের সাথে অসম লড়াই করে বেঁচে থাকা অাবার বাংলার অজস্র নদী খাল বিলে সাপের বাস,অনেক বাঙালির পেশা সাপ ধরে খেলা দেখানো, কবি প্রাচীন কাল থেকে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বাঙালি বেঁচে থাকাকে তুলনা করেছেন,তেমনি আবার বলেছেন পৌরানিক কাহিনি অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ কালিয়া নাগের ফনার ওপর নেচেছিলেন ৷ বাঙালির সাথে আছে পূর্বপুরুষের সাহস  আর উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওয়া বীরত্বের কাহিনী ৷ বিজয় সিংহের লঙ্কা জয়,ওনার নাম অনুসারে সিংহল নামকরণ  অর্থাৎ শ্রীলঙ্কাতেও বাঙালি বীরত্বের পরিচয় আছে ৷বিক্রম পুরের চাঁদ রায় ও যশোরের প্রতাপাদিত্যের মোগলদের প্রতিরোধ বা মগ আক্রমণকারীদের প্রতিহত করার গৌরবে গৌরবান্নিত বাংলা ৷ দর্শন শাস্ত্রের আদি পুরুষ কপিলমুণি ৷ কপিলমুণির সাংখ্যাদর্শন এখানে কবি বলছেন এটাও বাংলার গৌরব এই বঙ্গেরই দক্ষিণে গঙ্গাসাগরে কপিলমুণির আশ্রম আছে ৷ তিব্বতে অতীশ দীপঙ্করের বৌদ্ধধর্ম প্রসারের ভূমিকা,বাঙালি পন্ডিত রঘুনাথ শিরোমণির মিথিলার পণ্ডিত পক্ষধর মিশ্রকে বিতর্ক সভায় পরাজিত করেন ৷বাঙালি কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ রচনা ভারত বর্ষের সাহিত্যের সোনার পদ্মকে সুগন্ধে ভরিয়েছে ৷   দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সমুদ্র পথে বাংলার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল ৷ সেখানকার স্থাপত্যের সাথে বাংলার পাল সেন যুগের স্থাপত্যের ঐতিহাসিক মিল পাওয়া যায় ৷ এই বিষয় কে কেন্দ্রকরে কবি 'বরভূধর' স্তূপ ও 'ওংকারধাম' মন্দির এবং অজন্তা গুহাচিত্রে বাঙালির অবদানের কথা বলেছেন ৷ বিটপাল ও ধীমানের মত ভাস্করের এই বাংলায় জন্ম,তারা অবিনশ্বর তারা মনের গভীরের ভাবনাকে খোদাই করছে পাথরের গায়ে ৷ কীর্তন ও বাউল বাঙালির নিজস্ব সম্পদ ৷বাঙালি হৃদয়ের  তত্ত্ব কথাকে প্রকাশ করে মনের দরজাকে খুলে দিয়েছে বিশ্বের মাঝে গানের মাধ্যমে ৷দুর্ভিক্ষ মহামারীতে দেশ 

উজার হলেও পৃথিবী থেকে বাঙালি জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি ৷বাঙালি তার ভক্তির মধ্যদিয়ে দেবতাকে আপন করেছে আকাশ প্রদীপ জ্বেলে ৷ ঘরের ছেলে শ্রীচৈতন্যদেবের  মধ্যে বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ড ঠাকুরালি অর্থাৎ দেবতার মহিমা কে প্রত্যক্ষ করেছেন কবি৷ ব্যাঘ্র বৃষভের সমন্বয় অর্থাৎ বাঘ ও ষাঁড়ের মিলন ঘটানো বাস্তবে অসম্ভব ৷স্বামীজির শিকাগো বক্তৃতা পৃথিবীর মানুষকে মুগ্ধ করেছিলো ৷যে সব দেশ ভারতবাসীকে তাচ্ছিল্য করত তারাও স্বামীজির শিষ্যত্ব গ্রহন করেছে ৷আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু গাছের মধ্যে পেয়েছেন প্রাণের স্পন্দন,যা মৃতদেহের ওপর ঘোড়ায় চড়া ভঙ্গিতে তান্ত্রিকের শব সাধনার থেকেও অধিক ৷আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বিভিন্ন ধাতুর রাসায়নিক বিক্রয়া গরমিল ঘটিয়ে নূতন যৌগ তৈরী করেছেন ৷বাঙালির কবি  অর্থাৎ রবীন্দ্র নাথ ৷ রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে সভ্যতা সংস্কৃতির আদান প্রদানের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সব ধর্ম বর্ণের মানুষের মেলবন্ধনে অশাবাদী কবি মনে করেন বিধাতার আশির্বাদে বাঙালি কল্যাণময় কাজের দায়িত্ব নেবে ৷স্বদেশ স্বজাতি, বিশ্বের অন্য কোন দেশ ও জাতির তুলনায় কোন অংশে কম নয় বরং অনেক বেশি উন্নত — এই বোধ জাতীয়তাবাদী মানসিকতার মূল কথা ৷ বেতাল ও বিক্রমাদিত্যের কাহিনি অর্থাৎ বেতালপঞ্চবিংশতি উল্লেখ করেছেন ৷বেতাল বিক্রমাদিত্যকে একটা করে গল্প বলে সেই গল্প থেকে একটা কঠিন প্রশ্ন করতেন ৷কবি বলতে চেয়েছেন পৃথাবীর সমস্ত কঠিন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করার আগেই বাঙালি তার উত্তর দিয়েছে ৷ সত্যের পথে চলতে অনেক বাধা প্রলোভন আসবে,তাতে মন চঞ্চল হবে ৷কিন্তু সত্যকে প্রণাম করে দৃঢ়সংকল্প হয়ে বাঙালি সত্যের পথে এগিয়ে যাবে এবং বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি পাবে ৷শ্রীচৈতন্যদেব শেষ জীবনে বঙ্গের দক্ষিণে পুরীধামে গম্ভীরাস্থিতি অর্থাৎ ভাবমগ্ন অবস্থায় ছিলেন ৷তাই ভাবপ্রবণ বাঙালিও মহাপ্রভুর মত নিজস্ব ভাবনায় ডুবে থাকে ৷পঞ্চবটী হ'ল পাঁচ বৃক্ষ(অশ্বথ্ব,বট,বেল,অশোক,আমলকী)সমাহার ৷গাছ জীবন প্রবাহের ইঙ্গিত ৷ শ্মশান -যেখানে জীবন শেষ হয় ,সেখানেই পঞ্চবটীর অবস্থান জীবনের জয়গান গায় ৷ বাঙালি তার হৃদয়ের শক্তিতে শ্মশানকে পঞ্চবটীতে শুধু রূপান্তরিত করেনা, সব মানুষকে আপন করে নেয় ৷বাংলার ভূমিতে মেলে গোটা পৃথিবীর মানুষ ৷ উগ্রতাহীন জাতীয়তাবাদ মানসিকতার প্রকাশ কবির ৷অন্যদেশ বা জাতির প্রতি কোন ঘৃণার প্রকাশ এই কবিতায় নেই ৷ কবি আশা করেন বাঙালি একদিন জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন পাবে ৷সেই শ্রেষ্ঠত্ব কবি হিংসার মাধ্যমে চান না ৷বাঙালি তার শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পাক প্রতিভা ও সাধনার  মাধ্যমে ৷বাংলা তথা ভারতবর্ষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ ৷এমন দেশে জন্মগ্রহন করা যে কোন মানুষের কাছেই সৌভাগ্যের ৷পৃথিবীর মানুষকে মিলনের মহামন্ত্রে দীক্ষিত করে বাঙালি জাতি দেবতার ঋণ শোধ করবে ৷


            —'আমরা' কবিতা—


'মুক্তবেণীর গঙ্গা যেথায় মুক্তি বিতরে রঙ্গে

আমরা বাঙালী বাস করি সেই তীর্থে- বরদ বঙ্গে,

বাম হাতে যার কমলার ফুল, ডাহিনে মধুর-মালা,

ভালে কাঞ্চন-শৃঙ্গ-মুকুট, কিরণে ভূবন আলো,

কোল ভরা যার কনক ধান্য, বুকভরা যার স্নেহ,

চরণ পদ্ম, অতসী অপরাজিতায় ভূষিত দেহ,

সাগর যাহার বন্দনা রচে শত তরঙ্গ ভঙ্গে,

আমরা বাঙালী বাস করি সেই বাঞ্চিত ভূমি বঙ্গে।


বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আমরা বাঁচিয়া আছি,

আমরা হেলায় নাগেরে খেলাই, নাগেরি মাথায় নাচি।

আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে,

দশাননজয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে।

আমাদের ছেলে বিজয়সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়

সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্যের পরিচয়।

একহাতে মোরা মগের রুখেছি, মোগলের আর হাতে,

চাঁদ-প্রতাপের হুকুমে হঠিতে হয়েছে দিল্লীনাথে।


জ্ঞানের নিধান আদিবিদ্বান কপিল সাঙ্খ্যকার

এই বাঙ্গলার মাটিতে গাঁথিল সূত্রে হীরক-হার।

বাঙালী অতীশ লঙ্ঘিল গিরি তুষারে ভয়ঙ্কর,

জ্বালিল জ্ঞানের দীপ তিব্বতে বাঙালী দীপঙ্কর।

কিশোর বয়সে পক্ষধরের পক্ষশাতন করি,

বাঙালীর ছেলে ফিরে এল দেশে যশোর মুকুট পরি।

বাংলার রবি জয়দেব কবি কান্ত কোমল পদে

করেছে সুরভি সংস্কৃতের কাঞ্চন-কোকনদে।


স্থপতি মোদের স্থাপনা করেছে ‘বরভূদরের’ ভিত্তি,

শ্যাম কাম্বোজে ‘ওস্কার-ধাম’, -মোদেরি প্রাচীন কীর্তি।

ধেয়ানের ধনে মূর্তি দিয়েছে আমাদের ভাস্কর

বিট পাল আর ধীমান,- যাদের নাম অবিনশ্বর।

আমাদেরি কোন সুপটু পটুয়া লীলায়িত তুলিকায়

আমাদের পট অক্ষয় করে রেখেছে অজন্তায়।

কীর্তনে আর বাউলের গানে আমরা দিয়েছি খুলি

মনের গোপনে নিভৃত ভুবনে দ্বার ছিল যতগুলি।


মন্বন্তরে মরি নি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি,

বাঁচিয়া গিয়েছি বিধির আশীষে অমৃতের টিকা পরি।

দেবতারে মোরা আত্মীয় জানি, আকাশে প্রদীপ জ্বালি,

আমাদেরি এই কুটীরে দেখেছি মানুষের ঠাকুরালি,

ঘরের ছেলের চক্ষে দেখেছি বিশ্বভূপের ছায়া,

বাঙালীর হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া।

বীর সন্ন্যাসী বিবেকের বাণী ছটেছে জগৎময়,

বাঙালীর ছেলে ব্যাঘ্রে বৃষভে ঘটাবে সমন্বয়।


তপের প্রভাবে বাঙালী সাধক জড়ের পেয়েছে সাড়া,

আমাদের এই নবীন সাধনা শব-সাধনার বাড়া।

বিষম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালী দিয়েছে বিয়া,

মোদের নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া।

বাঙালীর কবি গাহিছে জগতে মহামিলনের গান,

বিফল নহে এ বাঙালী জনম, বিফল নহে এ প্রাণ।

ভবিষ্যতের পানে মোরা চাই আশাভরা আহ্বাদে,

বিধাতার কাজ সাধিবে বাঙালী ধাতার আশির্বাদে।


বেতালের মুখে প্রশ্ন যে ছিল আমরা নিয়েছি কেড়ে,

জবাব দিয়েছি জগতের আগে ভাবনা ও ভয় ছেড়ে,

বাঁচিয়া গিয়েছি সত্যের লাগি সর্ব করিয়া পণ,

সত্যে প্রণমি থেমেছে মনের অকারণ স্পন্দন।

সাধনা ফলেছে, প্রাণ পাওয়া গেছে জগত-প্রাণের হাটে,

সাগরের হাওয়া নিয়ে নিশ্বাসে গম্ভীরা নিশি কাটে,

শ্মশানের বুকে আমরা রোপণ করেছি পঞ্চবটী,

তাহারি ছায়ায় আমরা মিলাব জগতের শত কোটী।


মণি অতুলন ছিল যে গোপন সৃজনের শতদলে,

ভবিষ্যতের অমর সে বীজ আমাদেরি করতলে,

অতীতে যাহার হয়েছে সূচনা সে ঘটনা হবে হবে,

বিধাতার বরে ভরিবে ভূবন বাঙালীর গৌরবে।

প্রতিভার তপে সে ঘটনা হবে, লাগিবে না দ্বেষাদ্বেষি,

মিলনের মহামন্ত্রে মানবে দীক্ষিত করি ধীরে—

মুক্ত হইব দেব-ঋণে মোরা মুক্তবেণীর তীরে।'

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ