ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ || অনুবাদ - দেবলীনা চক্রবর্তী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের প্রয়াণ দিবসে আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ 

অনুবাদ - দেবলীনা চক্রবর্তী 

উর্দু কবিতার জগতে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ বিশ্বসাহিত্যে সবচেয়ে আলোচিত কবি এবং অন্যতম সেরা প্রগতিশীল উর্দু কবি। তিনি একজন মানবতাবাদী প্রেমিক কবি, বিপ্লবী কবি। জীবদ্দশায় ফয়েজ উর্দু কবিতার কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। ষাটের দশকে তাঁর কবিতা রুশ ভাষায় অনুদিত হয় এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলে সোভিয়েত ইউনিয়নে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা পান।  মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দূ বিভাগে ফয়েজের কবিতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৬২ সালে তিনি লেনিন শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল।

উর্দূ কাব্যের চিরায়ত ধারায় মননে এমন এক জীবনবোধ, এমন এক আঙ্গিক এবং বস্তুনিষ্ঠতা তিনি প্রকাশ করেন , যা পূর্ববর্তী কাল থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ও ভিন্ন। অথচ প্রশংসনীয় বিষয় হলো, কখনও সাহিত্যের সৌন্দর্য ও চেতনাবোধ, কাব্যিক উপাদান এবং শিল্পের দাবি তার কবিতা থেকে বাদ পড়েনি।

অখন্ড ভারতে পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে ১৯১১ সালের ১৩ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয়া এই কবি শিক্ষাজীবনে দীক্ষা নেন মার্ক্সবাদে। এম এন রায় আর মোজাফফরদের নেতৃত্বে প্রথমে নিখিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং পরে অখন্ড পাকিস্থানের কমিউনিস্ট পার্টিরও সদস্য ছিলেন তিনি। প্রথম জীবনে পশ্চিমের কবি কিটস্‌, শেলি, ব্রাউনিং-এ প্রভাবিত হন এবং পরবর্তীতে গভীরভাবে আসক্ত হন আল্লামা ইকবাল আর মির্জা গালিবে। পারস্যের মহান কবি সূফী জালালউদ্দিন রুমিতেও ফিদা ছিলেন ফয়েজ। দেখা যায়, শুধু কবিতা না, তাঁর জীবন আর দর্শনেও সূফীজমের বিস্তর প্রভাব। তাঁর অনেক কবিতাই সূফীজমের শান্ত অথচ ভাবের গভীর প্রত্যয়ে আচ্ছন্ন। সূফীজম অথবা অন্য যে কোন কারণেই হোক, শ্রমিক শ্রেনীর নেতৃত্বে বল প্রয়োগে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক দর্শনের জায়গা থেকেই একসময় সরে আসেন কবি ফয়েজ আহমেদ এবং হয়ে উঠেন মানবতাবাদী (humanist)!

ফয়েজ উর্দূ শের ও শায়েরীর জগতে এমন এক নাম যিনি সায়েরীর মূল বক্তব্যকে কখনোই অব্যক্ত রাখেন নি। সারা জীবন গজলের কোমল ও মেজাজী রূপের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন তিনি ও তাঁর লেখনী। আহমেদ ফয়েজ উর্দূ সাহিত্যের সেই বিখ্যাত নাম যিনি দুঃখকে বা বিরহকে এক অন্য দৃষ্টিভঙ্গি ও মনলোভা আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন ফলে উর্দূ শায়েরী আমাদের কাছে এক নম্র ও মসৃণ অনুভবে ধরা দিয়েছে এবং যেখানে উর্দু কবিতায় বা গজলের ধারায় সনাতনধর্মী নর-নারীর প্রেমের বাইরে কিছু নেই সেখানে তাঁর লেখনী ও উপস্থাপন সম্পূর্ন ভিন্নরকম। 

আজ তাঁরই উর্দূ সাহিত্যের ভিন্ন অনুভূতি ও আঙ্গিকে লেখা কিছু  শায়েরীর অংশ অনুবাদের চেষ্টা করলাম এবং এর মাধ্যমেই আমি 

তাঁর প্রয়াণ দিবসে আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করলাম |

১)

তোমাকে পাওয়ার আশা' ই এই মনের ভরসা 

আর তোমার থেকে বিচ্ছেদের ভয়ও আর যায় না 

২)

চোখের দূরত্বই মনকে আড়াল করে

সময় তো পেরিয়ে যায় সময়ের স্বভাবে

৩)

ভালোবাসার বাজি রেখে দেখো তুমিও

হেরে যাওয়ার হিম্মত আছে আমারও

৪)

এখন মনের ইচ্ছা মাত্র যেন এই হয় 

অশ্রুর বদলে যেন সদিচ্ছা প্রকাশ পায়।

৫)

হে আমার শত্রু আমি নিরূপায়,

না চাইতেও তোমার জন্য মন থেকে আমার 

শুধু প্রার্থনা প্রকাশ পায়। 

৬)

কত সহজ ছিল প্রাণ হারানো তোমার বিরহে 

কিন্তু এক জনম চলে গেল শ্বাস যেতে যেতে 

৭)

শহরবাসীর ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ - নিরুত্তর

কিন্তু যে যে হাতে চুম্বন করেছি প্রতিটা শাণিত ছোরা

৮)

যখনই কেউ মন ভরে কাঁদে

তখনই হয়ত তার আরামের ঘুম আসে

৯)

 আগামীর প্রতিটা রাত পরে আছে বিচ্ছেদ - বিরহে

সে আমায় ছেড়ে গিয়েছে সন্ধ্যের শুরু হতে হতে 

১০)

কিছু ভালোবাসাবাসি আর কিছু কাজ

তারাই সৌভাগ্যবান যারা ভালোবাসাকেই কাজ বলেন অথবা কাজকেই যারা ভালোবাসেন

আমি তো জীবনভর রইলাম মশগুল

কিছু ভালোবাসাবাসিতে আর কিছু কাজে 

কখনো কাজ ভালোবাসার আগল হয়েছে 

তো কখনো ভালোবাসার জালে কাজ জড়িয়ে পরেছে এই দ্বন্দ্বের শেষে বীতশ্রদ্ধ আমি 

 অসম্পূর্ণ রেখে আসি - 

কাজ ও ভালোবাসাবাসি-দের।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ