বঙ্গের লৌকিক দেবী শীতলা মাতা ও সালকিয়া" || ডঃ বিরাজলক্ষী ঘোষ (মজুমদার)




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 "বঙ্গের লৌকিক দেবী শীতলা মাতা ও সালকিয়া" কলমে,  ডঃ বিরাজলক্ষী ঘোষ (মজুমদার)

প্রাচীন বঙ্গের লৌকিক দেব দেবীর অনেক গুলি সালকিয়া তে আড়ম্বর সহ পূজিত বহু কাল থেকে।কারণ সালকিয়া পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম শহর।লৌকিক দেব দেবীর মধ্যে শীতলা মাতার পূজা এখানে জনপ্রিয়।পল্লী বাংলার পালা পার্বণের মধ্যে এই পুজো অন্যতম যা এখনও এলাকার মানুষ সুষ্ঠ ভাবে বজায় রেখেছেন।মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে উত্তর হাওড়া র শীতলা মাতার স্নান যাত্রা এই অঞ্চলের একটি বড়ো উৎসব। শোনা যায় শবর বা জেলে দের মধ্যে এই অনার্য দেবী খুবই প্রসিদ্ধ। সাধারণত বসন্ত রোগের দেবী বলেই সুপ্রাচীন কাল থেকে মানুষের জানা।শীতলা মত সাধারণত গুটিদানা জনিত রোগ যেমন হাম বসন্ত ইত্যাদির দেবী।শীতের পর ঋতু পরিবর্তন কালে সমস্ত উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে।ফলে এই সময় বসন্তের মিষ্টি দখিনা বাতাস কেবল প্রেমের হাওয়া বয়ে আনে না তার সঙ্গে নিয়ে আসে বসন্ত রোগ।হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে আদ্যাশক্তি দেবী দুর্গার অবতার হিসাবে মা শীতলা এই বসন্ত রোগ থেকে উদ্ধার করেন।গ্রাম বাংলায় বসন্ত রোগকে অনেক সময় মায়ের দোয়া বলা হ।এবং এই রোগ হলে মার পূজা দিলে মা সন্তুষ্ট হন ও রোগ মুক্তি হয় বলেই অনেক মানুষের ধারণা ।

শীতলা মাতা অনার্য দেবী হলেও তার পূজা বহু প্রাচীন।প্রাচীন রামায়ণ ও মহাভারতে ও এই পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়।বিরাট রাজ্যে একবার বসন্ত দেখা দিলে বিরাট রাজাও মত শীতলা র পুজো করে রাজ্যকে ব্যাধি  মুক্ত করেছিলেন।বাংলাদেশের কিছু জায়গায় চৈত্র মাসে এই পুজো অনুষ্ঠিত হলেও সালকিয়া তে পুজিতি হয় মাঘী পূর্ণিমা তে।ঠিক কবে থে এই পূজার প্রচলন হয় তার সঠিক কোনো তথ্য নেই।তবে কথিত আছে বাঁধা ঘাটে কর্তব্যরত এক পুলিশ অফিসার মাঘ মাসের এক পূর্ণিমায় সাতজন মহিলাকে গঙ্গা স্নান করতে দেখেন।এই দৃশ্য বেশ কিছু মানুষ কে তিনি বলেন এবং মারা যান।তারপর থেকেই এই অঞ্চলে শীতলা মাতার স্নান যাত্রা শুরু হয়।

পুরাণের একটি গল্পে উল্লেখ আছে যে একবার দেবী পার্বতী কাত্যায়নী নামে একটি ছোট কন্যা রূপে মর্ত্যে আবির্ভূত হন।তিনি ছিলেন ঋষি কাত্যায়নের কন্যা।দৈত্য রাজ কালকেয় দ্বারা প্রেরিত বহু অসুর কে এই ঋষি  হত্যা করেছিলেন।এই সময় জ্বরাসুর নামে এক অসুরের প্রভাবে কাত্যায়নীর শৈশব কালীন বন্ধুগণের মধ্যে আমাশয়,গুটি বসন্ত,জ্বর প্রভৃতি রোগ এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ।এখন আমরা এসব রোগ কে তেমন গুরুত্ব দেই না কিন্তু প্রাচীন কলে এগুলোই মারণ রোগ ছিল।এই সময় কথিত কাহিনী অনুযায়ী কাত্যায়নী তার বন্ধুদের প্রাণ রক্ষা করতে কাত্যায়নী শীতলা মাতার রূপ ধারণ করেন।

গর্দভ এর পিঠে চড়ে উলঙ্গ শীতলা  মাথা মস্তকে কুলো,এক হাতে ঝাড়ু অপর হাতে শীতল পানীয় এবং নিমপাতা সহ তিনি অধিষ্ঠিতা।কাত্যায়নীর মিত্র বটুক যা ছিল আসলে ভগবান শিবের রূপ ভয়ানক ভৈরব রূপ ধারণ করে জ্বরাসুর কে বোধ করেন ও কাত্যায়নীর দাস হয়ে থাকতে বলেন।তাই মা শীতলা এর পাশে জ্বরসুর কে আমরা দেখি।শীতলা মঙ্গল কাব্য বলেছে তিনি জ্বরের দেবতা ।তাই শিশুদের জ্বর হলে তাকে পুজো দেবার রীতি প্রচলিত আছে।তার সঙ্গে শীতলা মার সঙ্গে আছেন বাবা পঞ্চানন যিনি মহাদেবেরি রূপ।

অন্যান্য জায়গায় শীতলা দেবীর পূর্ণ অবয়ব দেখা গেলেও সালকিয়া অঞ্চলে তাকে আবক্ষ রূপেই দেখা যায়।শোনা যায় এই শীতলা মাতারা সাত বোন।এদের কেউ দারু নির্মিত কেউবা মাটির হাড়িতে অঙ্কিত।শুধু মাত্র কয়েলবাগান এর মূর্তিটি পাথর দ্বারা নির্মিত।এই অরবিন্দ রোডের বড়ো মা ও কয়েল বাগানের মা সয়ম্ভু বলে মনে করা হয়।বর্তমানে বহু মাতার পূজা এখানে অনুষ্ঠিত হয়।একমাত্র উপেন্দ্র নাথ মিত্রবলেনের মা কখনো স্নানে বের হন না।বাকিরা সকলে বড়ো মার মন্দিরের সামনে দিয়েই গঙ্গা স্নান করতে যান।উপোসী ভক্তরা মাকে কাধে নেয় ও স্নান করায়।

হিন্দুরা বসন্তের দেবীকে বলেন শীতলা,মুসলমানরা বলেন বুড়াবুবু বৌদ্ধ রা বলেন হারিট,চীনারা বলেন ঊষা।বাংলার মাটি ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর ভারত,নেপাল,বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বহু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও এই দেবীর উপাসনা করা হয়।

শোনা যায় হাতের কলস থেকে তিনি আরোগ্য সুধা দান করেন।ও ঝাড়ু দিয়ে সমস্ত ময়লা পরিষ্কার করেন।পুজোর দিনেও তার মন্ধির ও রাস্তা ঘাট পরিচ্ছন্ন করা হয় এবং জল ছিটানো হয় ।কথিত আছে তিনি স্নান করে যেমন শরীর শীতল করেন তেমন ধরিত্রীকে ও শীতল করেন।এইখানে এসে কোথাও যেনো ধর্ম আর বিজ্ঞান মিশে যায়।মা শীতলা পরিচ্ছন্নতার দেবী।তাই বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলেও সকলে ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখেন এবং প্রত্যহ ধুপ ধুনা দেন।অর্থাৎ বসন্তের এই সময় শরীর কে ভিতর থেকে শীতল রাখা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন তা অত্যন্ত জরুরী।এর ফলে বৈজ্ঞানিক ভাবেই বহু রোগের হাত থেকে মানুষ মুক্ত হতে পারে। এ কারণে শীতলা মাতার পূজার পরদিন ঠাণ্ডা উপোস অনেক জায়গায় প্রচলিত।সাধারণ মানুষ আধ্যাত্মিকতার মধ্যেই দিয়েই বিজ্ঞানের কাছে পৌঁছে যান। 

প্রাচীন বঙ্গের লোক দেবী হলেও সালকিয়ার অনার্য দেবী শীতলা মাতার স্নান যাত্রা কালক্রমে বহু ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মিলনের এক অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে এগিয়ে চলেছে।চারদিকে অশান্ত পরিবেশে সম্প্রদায় গত বিরোধ এর মাঝে প্রাদেশিকতার দুষ্ট ক্ষতের উপর এই অঞ্চলের পূজিত মা শীতলার স্নান যাত্রা সালকিয়া বাসির নিকট এক শান্তির মলমের প্রলেপ ।।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ