সুমিত ও গ্রাম|| তৃতীয় পর্ব || মঙ্গল মিদ্যা (রিপল)




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 সুমিত ও গ্রাম

( তৃতীয় পর্ব ) 

 মঙ্গল মিদ্যা (রিপল)

বেশ অনেকগুলো মাস কাটিয়ে ফেললো গ্রামেতে সুমিত। এর মধ্যে গাছ কেটে দেওয়া, বাড়িতে কালিপুজা করা, কেউ খবর দিলে রুগী দেখতে যাওয়া, এমনকী বাইরের দিকে ঠাকুরদা একটা ডাক্তারী চেম্বার মতো করে দিয়েছে, কিন্তু সেখানে বসা আর না বসা সমান সুমিতের পক্ষে কারণ বাড়িতে রুগী দেখতেই বেশি সময় কেটে যায়। তবে যারা চেম্বারে আসে তারা ফেরৎ যায় না বা দূর থেকে যদি কোন গুরুতর রূগী আসে তাহলে সুমিত যেখানেই থাকুক না কেনো ঠিক কেউ না কেউ খবর দিয়ে দেয়। 

একদিন চেম্বারে প্রিয়া মানে সেই *হঠাৎ পর্বের* সুজাতার আত্মার মুক্তি দিয়েছিলো...., সেই সে এসেছিলো। সুমিত নিজের স্ট্যাথিস্কোপ নিয়ে প্রিয়ার হৃদকম্পন্ শুনতে যাবে তখন প্রিয়া বললো ভেতরে চলো আলাদা কথা আছে।

সুমিত পর্দা টানা ভেতরের ঘরে গেলো আর সুমিতকে জড়িয়ে ধরলো। সুমিতও অনুভবে চোখ বন্ধ করে নিলো.....।

       আর তারপর খেয়াল করলো, দূর এসব সে কি করছে। প্রিয়া তো নেই, সে তো আসেনি এখানে। সুমিত মনে মনে কল্পনায় এইসব ভাবছিলো। অবশ্য বাড়ির কালিপুজার সময় প্রিয়া ও তার বাবা-মা এসেছিলো ঠাকুরদার নেমন্তন্ন রাখতে। প্রীতির সাথে খুব আলাপ হয়েছিলো।

যাইহোক, সুমিত নিজেকে শান্ত করে আবার নিজের চেয়ারে এসে বসেছিলো।

ডাক্তারের এমন কান্ড দেখে চেম্বারে অসুখ দেখাতে আসা দুজন মিটি মিটি হেসেছিলো।

যাইহোক, ওই দুজনার পরে ১জন বয়ষ্ক লোক এলেন। বেলা অনেক হয়েছে এনাকে দেখার পরে চেম্বার বন্ধ করে স্নান খাওয়া করবেন।

বয়ষ্ক লোকটি এসে সুমিতের পাশের চেয়ারে বসলেন। সুমিত স্ট্যাথিস্কোপ নিয়ে ওনার বুকে রেখে চমকে উঠলেন আর খানিকটা চেয়ার সমেত সরে এলো। অল্পের জন্য চেয়ার সমেত পড়তে পড়তে বেঁচে গেলো। সামনের টেবিলের পায়ার কাছে থাকা মগটা নিয়ে জল খেলো। নিজেকে শান্ত করার চেস্টা করলো। কারণ এই বয়ষ্ক লোকটার হৃদকম্পন নেই। ইনি মারা গেছেন।

সুমিত নিজের মাথাটা দু-হাত দিয়ে চাপলেন তারপর আঙুল দিয়ে কপালটা মলতে লাগলো। আর ভাবতে থাকলো - "আজ তার সাথে কি হচ্ছে, তার কি শরীর খারাপ, ঘুম কম হয়েছে নাকি.....? এইসব। 

তখন বৃদ্ধ লোকটি বয়সজনীন কারণে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন - "আরে তুমি ভয় পাচ্ছো কেনো, তুমি তো বিজ্ঞানের ছাত্র, বিজ্ঞান তো ভূত বা অশরীরি বিশ্বাস করে না "।

সুমিত ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বললো - "আমি সব বিশ্বাস করি, যেমন ভগবানকে তেমন বিজ্ঞানকে আবার অশরীরিকেও, কারণ আমার সাথে যা যা হয়েছে তাতে বিশ্বাস না করার কারণ নেই।"

বৃদ্ধ যেনো মৃদু হাসলেন তারপর বললেন - "আমি তাহলে যগ্য ব্যক্তিকেই পেয়েছি। আমার নাম সুবিনয় ডাক্তার, তুমি আমার ঘর থেকে ১টা দুর্লভ বই পাবে, সেটা নিয়ে আসবে "।

আরো কিছু বলবেন বলে কিন্তু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকেন, শেষে শুধু বললেন "৩সংখ্যা" টা গুরুত্বপূর্ণ।

সুমিতের কানে এলো "ওই দাদা চল স্নান খাওয়া করবি !"

বৃদ্ধ লোকটি ততোক্ষণে মিলিয়ে গেলেন। সুমিত প্রথমে প্রীতির দিকে অবাক ভাবে তাকালো তারপর ধমক দিয়ে বললো - "তোর আর আসার সময় হলো না, যা বেরিয়ে যা আগে এখান থেকে "।  ধমকটা এতোটা জোরে আর তীব্র ছিলো যে প্রীতি কেঁপে কেঁপে উঠছিলো আর তারপর কান্না কান্না ভাব নিয়ে চলে এলো ওখান থেকে। আর সুমিত চুপ করে চেয়ারে বসে বসে রইলো।

অল্পখন পরে সুমিত চেম্বার বন্ধ করে প্রথমেই প্রীতির ঘরে গেলো কিন্তু তাকে দেখতে পেলো না। বড়ো বউদি বললো তোমার ঘরে ঢুকে রাগ দেখাচ্ছে দেখো। সুমিত তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখে সুমিতের ১টা ফটো বিছানায় রেখে ছড়ি দিয়ে মেরে যাচ্ছে, শুধু ফটোতে নয় সুমিতের শুয়ে থাকার জায়গার মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে মেরেই চলেছে।

বউদি বললো - "ও ওমনই রাগ হলে তার ফটোতে বা তার জামা বা তার জিনিসের উপর মেরে মেরে রাগ দেখায়।"

সুমিত তাড়াতাড়ি গিয়ে প্রীতির হাতটা ধরে নিজের গায়ে মারতে থাকে। প্রীতি কান্না থামালো না, ঘর থেকে চলে যেতে লাগলো। সুমিত বাঁধা দিয়ে তার হাত দুটো ধরে কেমন যেনো কান্না কান্না গলায় বললো - "বোন আমার রাগ করিস না, আমি তোকে ওমন বলতে চাইনি, তোর মনে কস্ট দিতে চাইনি রে, আসলে এমন একটা ঘটনা হলো ওইসময়। সুবিনয় ডাক্তারের আত্মা এসেছিলো, ওনার কাছে নাকি ১টা খুব দুর্লভ বই আছে। কিন্তু কোথায় আছে সেটা বলার আগেই তুই ডাক দিলি তাই একটু রেগে ওমন বলেছি রে, তুই আমাকে মেরে নে...."! বলেই প্রীতির পায়ের কাছে মাথা নীচু করলো।

বউদি বলে উঠলো - "ঠাকুরপো, যতো ভূত প্রেত্নীরা মরতে তোমার কাছে আসে কেনো "!

প্রীতি ফোঁপানি গলায় ধমক দিয়ে বললো - "তোমার তাতে কি, তুমি তোমার কাজে যাও, আমার দাদার কাছে কে আসবে আর কে আসবে না সেটা কি তোমার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে নাকি "।

বউদি হাসি গলায় "বাব্বা মেয়ের রাগ কমেছে দেখছি" বলে চলে গেলো।

সুমিত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো "বোন, ওই বইটা আমাকে পেতেই হবে রে "।


বিকাল বিকাল দুই ভাই বোনে রওনা দিলো সুবিনয় ডাক্তারের বাড়িতে। ৩টে গ্রামের পরেই ওনার ঘর। ছেলে কলকাতায় থাকে, বড়ো হসপিটালে সরকারি চাকরি করে। গ্রামের বাড়িটা তাই কাকারাই নিয়ে নিয়েছে। ঘরের ভেতরে কাঠের আলমারীতে অনেক বই রাখা।

সুমিতের কাছে সব বই আয়ুর্বেদের দুর্লভ মনে হলো। সুমিতের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো "বোন, এগুলো যে এক একটা মহৌষধির বই রে ।"

তারপর "৩সংখ্যার" কথাটা মনে পড়লো তাই উপর থেকে ৩নং রাকের ৩নং বইটা বেরর করে দেখলো "তুলসীর গুণাগুন" । সুমিত একটু অবাক হলো তারপর বাকদিকের ৩নং বইটা বের করে দেখলো "বহু রোগ সারাতে নিম্ "। নীচ থেকে ৩নং রাকে বাম ও ডান দিকে দেখলো "গ্রামীণ নানান শাকের উপকারিতা ","আয়ু বাড়াতে ব্যায়াম "। সুমিত চুপ হয়ে প্রীতির দিকে তাকালে। সে তখন বিছানার কাছে রাখা ডয়ারের কাছে ১টা বাচ্ছার ফটো দেখছিলো। সুমিত জিজ্ঞাসা করায় প্রথমে এড়িয়ে গেলেও পরে বললো স্কুলে ও প্রীতিকে ভালোবাসতো, আর প্রীতিও মনে মনে, তারপর ও কলকাতা চলে যায় আর প্রীতিকে মনে রাখেনি কোন খবরও নেয়নি, যোগাযোগ রাখার চেস্টা করেনি।

কথাগুলো বলতে বলতে প্রীতির চোখের কোণে যেনো জল এসেছিলো। তখন সুমিত বোনকে শান্তনা দিয়ে গিয়ে দেখে ডয়ারেও ৩টে রাক আছে। সুমিত সেটা খুললো আর ১টা ডায়রি পেলো, তবে কি এটার কথাই বলছিলো। হতেই পারে, তাই তারা সেটা নিয়ে বাড়ি ফিরলো।

            ২দিনে সুমিত সবটা পড়ে শেষ করেছে, সুবিনয় বাবুর আমলে ওষুধ আনতে বিশেষ বিশেষ দিনে সুতানুটি(কলকাতা) যেতে হতো, তাও আবার সবসময় সব ওষুধ পাওয়াও যেতো না, গ্রামের মানুষদের থেকে যাওয়া-আসার খরচ উঠতো না উল্টে ওষুধ বেশি বছর রাখাও যেতো না বিষাক্ত হয়ে যেতো। তাই সুবিনয় বাবু বই কিনে সেইমত ওষুধ তৈরি করে নিতেন। গ্রামে তো মোটামুটি সবই পাওয়া যায়। আর তা তৈরি করতে গিয়ে নিজেও কিছু কিছু টুকিটাকি নুতন ওষুধ আবিষ্কার করেছেন, তার প্রদ্ধতি নিজের আয়নার পিছুনে বিশেষ ভাবে রাখা আছে।


সুমিত সেই বইটাও খুঁজে বের করেছিলো। অনেকগুলোর মধ্য ১টা হলো জবা পাতার রস জলের সাথে মিশিয়ে পেট ঠান্ডা করার মক্ষম ওষুধ হয়। এছাড়া বিশেষ ১টা গাছের মূল জ্বর হওয়া রুগীর গায়ে ৩দিন রাখলে জ্বর কমে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি।

আলমারীতে থাকা বইগুলো সংগ্রহ করে রাখার ব্যবস্থা করলো সুমিত। শুধু সেই আয়নার পিছুনে থাকা বইটা ছাড়া।।


★ প্রথম পর্ব

★ দ্বিতীয় পর্ব 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য