দর্পণ || বিদায়বেলায় || সাবিত্রী জানা ষন্নিগ্রহী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 বিদ‍্যামায়ের আরাধনা

বিদায়বেলায়

সাবিত্রী জানা ষন্নিগ্রহী


"বসন্ত পঞ্চমী" ---বাগময়ী দেবী সরস্বতীর আরাধনা --তিথিটি আসার আগে সে এক বিশাল মহড়া চলে --বাড়িতে বাড়িতে, পাড়ার ক্লাবে ক্লাবে, স্কুলে স্কুলে, শহরে আবাসনগুলোতে। কচিকাচাসহ বুড়োবুড়ি সবাই যেন আনন্দে একসূতোয় বাঁধা পড়ে। --পূজোর দিনে খুশির ঢেউ আন্দোলিত হয় কচিকাচাদের চোখে-মুখে, তরুণ-তরুণীদের মনে আর বয়স্ক-বয়স্কাদের সংস্কৃতির গহন-গভীরে।-অপ্রয়োজনীয় কত কথার মালা অলিতে-গলিতে, বাতাসে বাতাসে উড়ে বেড়ায় --পরপর তিনদিন। গাছের পাতায় পাতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে হারিয়ে যায় কত কত সুরে কত কত গানের কলি। ---আর বিদায়বেলায় যেন করুনচোখে দেবীপানে চেয়ে থাকা---ঠিক যেন চোখে চোখে কথা হয়ে যায়--আবার আসবে তুমি --আগামী বছর। ---

আমার বাড়ির পূজোটাকে একটু বিশ্রাম দিয়ে নতুনের কোলে একটু মাথা রাখলাম। --এ বছর আমাদের আবাসনে সরস্বতী পূজোর বয়স মাত্র চারবছর। প্রথম বছরের পূজোটা আমি ধরতে পারিনি। দ্বিতীয় বছরের পূজোটাকে আপন করবো কি করবো না ভাবতে ভাবতে অজান্তেই মা সরস্বতী আপন করে নিলে। শুভাশীষ, সুভাষ ও সমীরনের তত্ত্বাবধানে আরম্ভ হোল সরস্বতী বন্দনা। সকাল বেলায় স্নান সেরে সবাই অঞ্জলি দিলাম। প্রসাদ খেয়ে হলঘরে সবাই মিলে দুপুরের খাওয়া সারা হোল। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান। দিবেন্দ‍্যুর কন্ঠে সঞ্চালনার ভাষা। অনিতার কন্ঠে উদ্বোধনী গান পরিবেশিত হওয়ার পরেই বাচ্চাগুলো নাচছে। --তার আগে মহড়া হয়ে গেছে অনিতার ডাইনিং হলে --হারমোনিয়ামের রিডগুলোতে স্বর ও অনিতার কন্ঠের সুর মিলিয়ে বড়রা-বাচ্চারা গান অভ‍্যাস করেছে--উজাড় করে দেবে মা সরস্বতীর সামনে। ---স্বাতীসহ বাচ্চা মেয়েগুলো গানের সুরে সুরে নিজেদের চোখ- মাথা-হাত-পায়ের ছন্দ মেলে দিচ্ছিল ছোট্ট কাঠের স্টেজের উপর। আমার ফ্ল্যাটের বিপরীতে আরতি --ও ছত্রিশ বছর পর গান গেয়েছে --অনিতার আন্তরিক সহায়তায়। সঞ্চিতা তার ঢেউখেলানো কন্ঠে নিবেদন করেছিল কবি সুবোধ সরকারের  কবিতা। গলার গভীর থেকে ঝরে ঝরে পড়ছিল --"ময়ূরপঙ্খী, শাড়ি --কৃষ্ণকলি মাহাতো"--র প্রতিটি শব্দ। মনে হচ্ছিল --সেই মেয়েটাই-যে মেয়েটা শাড়ীগুলো আলমারিতে গুছিয়ে রাখছে-যে মেয়েটা কৃষ্ণকলি--যে মেয়েটা ময়ূরপঙ্খীর মেয়ে, যে মেয়েটা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে সবার সামনে তুলে ধরছে তার মনের কোনে লুকিয়ে রাখা প্রতিটি বেদনা। বিভোর হয়ে শুনছিলাম আর ভাবছিলাম আমার স্কুলের অনুষ্ঠানের স্টেজ--যেথায় রবিঠাকুরের "বিসর্জন" নাটকের মেয়েটি। হাতে থালা-থালার উপর জ্বলন্ত প্রদীপ, ফুলের মালা, ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে বেদীর 'পরে পূজো করবে। ---সিঁথিতে সিঁদুর পরতে পরতে রাজবধুর হাত থেকে খসে পড়লো আয়না। পূজোর থালা হাতে শ্রীমতীকে দেখে ধমক দিয়ে চলে যেতে বললেন। --দুটো দৈত্য এসে ঘাড়ের উপর বসালো তলোয়ারের কোপ--রক্তে ভেসে যাচ্ছে স্টেজ। শ্রীমতীর পূজো দেওয়া হোল না।

 স্টেজে উঠেছে একটি ছোট্ট ছেলে। কি সুন্দর নাচছে--হিন্দি গানের তালে তালে। বাব্-ব্বা-রে-এইটুকু বাচ্চা কি তাল-কি ছন্দ। বুড়োবুড়ি থেকে আরম্ভ করে সবার মাথা-পা ছন্দে ছন্দে দুলছে। সেবার কচিকচি শিশু --শুভায়ন, শুভায়ু, ঋক্, ইমন আর কতকগুলো বাচ্চা মেয়ে অনুষ্ঠানটিকে মাতিয়ে দিয়েছিল। সেই যে আরতি- যার মজ্জায় মজ্জায় বাঙালির সংস্কৃতি মিশে আছে-অনুষ্ঠানের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল। সবশেষে গীতাপাঠ করেছিল। আমার মনে উপরি খুশির জোয়ার বইছে--কৃষ্ণকথা শুনতে পেয়েছি। 

--পরেরদিন প্রতিমা বিসর্জনের পালা। মনখারাপের ধারাপাত --বাচ্চা-বাচ্চাদের বাবা মায়ের গতানুগতিক জীবন --পড়তে বসাও-স্কুলে যাও, পরীক্ষা দাও, নম্বরের জোয়ার ভাঁটা। আবার এক বছর অপেক্ষা করতে হবে দুটো দিন স্বাধীনতার জন‍্য। ---মেয়েরা কনকাঞ্জলির জন্য তৈরী। সবাই মিলে প্রতিমাকে মিষ্টি খাওয়ানো, সিঁদুর পরানো, ঝকঝকে গ্লাসের জলে মুখ ধুইয়ে দেওয়া ও নিজের আঁচল দিয়ে মায়ের মুখ মুছিয়ে বিদায় দেওয়া। গানে-নাচে মুখরিত আবাসনের হাঁটার পরিসর। --বিদায়বেলায় ""আলোয়ালা বাপীদা"" --চলেছেন আগে আগে। ট্রলিতে চলেছেন মা সরস্বতী --গঙ্গায় ডুব দেবেন। পেছনে বাচ্চারা -আমরা বড়রা কয়েকজন। সমীরণের হাত ধরে মা ডুব দিলেন গঙ্গার হিম কনকনে জলে। পরের দিন মা ষষ্ঠীর পূজো-অরন্ধন। আগের বছর আরতি আমাদের "গোটাসেদ্ধ" ও মিষ্টি খাইয়েছিল। গোটাসেদ্ধ-র সাথে আমার এক বন্ধন জড়িয়ে আছে। আমার বিয়ের ছোটবেলার কয়েকটা সরস্বতী পূজোর পরদিন কেটেছে দিদিমা-শাশ্বুড়ীর হাতের গোটাসেদ্ধ খেয়ে। পাঁচরকমের গোটা ফল-তারসাথে আরো কিছু দিয়ে সেদ্ধ, কাখরা ও গড়গড়‍্যা পিঠে। কি অপূর্ব স্বাদ। রিটায়ার্ড করার আগে নয় বছর খাইয়েছে আমার এক কলিগের স্ত্রী। ফোনে নেমতন্ন করতো --দিদি গোটাসেদ্ধ খেয়ে যাবেন। আবাসনে আমার দ্বিতীয় পূজোর গোটাসেদ্ধ খেয়েছিলাম মৌসুমীর হাতে। আলোয়ালা বাপীদাদার স্ত্রী --মিষ্টি মৌসুমী।

২০২০ সালের সরস্বতী বিসর্জনের সাথে সাথেই উবে গেল সব খুশী--সবার মন থেকে। "করোণা"--নামে অজানা শত্রুর হানা। সারা বছরটা কেবল খারাপ রাখার পরিকল্পনা। --প্রতিদিন কেউ না কেউ মা সরস্বতীর মতো বিদায় নিচ্ছে--কোন দরখাস্ত ছাড়াই। --হ‍্যাঁ আমাদের আবাসনে ""আলোয়ালা বাপীদাদা"" ও কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ নিরুদ্দেশের পথে। আর কোনদিন ফিরবেন না। "আলোয়ালা"--নামটা আমি দিয়েছিলাম। উনার চোখে-মুখে এক স্বচ্ছতা -সরলতার সাদা আলো সব সময় ছেয়ে থাকতো। অভিধানে বিরক্ত শব্দটির সাথে উনার পরিচয় হয়নি। খবরটি পাওয়ার পর বুঝতে একটু সময় লেগেছিল। শেষ দেখা হয়েছিল বৌ মৌসুমীকে নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। --মৌসুমী কিভাবে নিজেকে সামলাবে ? 

--সব মনবেদনা ত‍্যাগ করে ২০২১ এর সরস্বতী পূজোর  খুশির বাতাস বইতে লাগলো আবাসনের সবার হৃদয়ে। --স্বাতীর ডাইনিং টেবিলের পাশে ছোট্ট পরিসরে নাচের মহড়া চললো ক্ষুদে ক্ষুদে মেয়েদের। সঞ্জীবনের বাবার পরিচালনায় চললো স্বচ্ছ পানিয় জলের খোঁজ --রবিঠাকুরের ""অবাক জলপান""এর নাট‍্য মহড়া-।

যথাসময়ে স্টেজের উপর অনিতার উদ্বোধনী দিয়ে সূচনা হোল অনুষ্ঠান। চার বালিকার নাচ--স্বাতীর আপ্রাণ তালিমের প্রয়াস। মহুয়ার সুরেলা গলা ভরিয়ে দিলে দর্শক-শ্রোতাদের মন।  পিঠে ফেলে রাখা লম্বা চুলের বেনী -অর্পিতা উজাড় করে দিলে অন্তরের গভীর থেকে তুলে আনা "আফ্রিকা"। সঞ্চিতা একটু ও কার্পণ্য করেনি তার গলার খাঁজে খাঁজে বয়ে চলা কবিতার কথাগুলো উজাড় করে দিতে। --অনুষ্ঠান জমে উঠেছে অনিতা, সঞ্চিতা, অনিন্দিতা, অর্পিতা, মহুয়া, স্বাতী-আরো আরো সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায়। সবশেষে অবাক করলে শিশুদল--"অবাক জলপান" পরিবেশন করে। একটু স্বচ্ছ পানীয় জলের আশায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত পথিক-- ঋক্-- হতাশ-ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। সত্যিই তো--স্বচ্ছ পানীয় জল কি আর মিলবে?? সবশেষে একটুকরো জল মিললো --ছোট্ট ভাইবোন ঋকদাদার জলতেষ্টার কষ্ট বুঝতে পেরে ওদের সাধ‍্যমতো কিছুটা জল এনে দিলে --পিপাসার্ত পথিক তাতেই তেষ্টা মেটালে। 

---শিশুদল খুশীতে ডগমগ --আমরাও। ওদের গলায় একএকটি মেডেল ঝুলছে-অনুষ্ঠানে ওদেরই দেওয়া স্বীকৃতি।   

------মধুরেন সমাপয়েত----।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য