বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত || আব্দুর রহমান নির্জয়




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত

 আব্দুর রহমান নির্জয়


পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে বা লড়াই করেছে এমন দেশ বা জাতির নাম যেমন বিরল , ঠিক তেমন বাংলা ভাষার দাবীতে আত্মত্যাগের জন্য বাংলাদেশের নাম পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে চিরদিন । বাংলা ভাষা যেমন বাঙ্গালি জাতির জীবন সত্ত্বার সাথে জড়িত , বাংলা সাহিত্য ঠিক তেমন বাঙ্গালি জাতির প্রাণ সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ । সেই অতি প্রাচীন কাল থেকেই বাঙ্গালি জাতি বাংলা সাহিত্যের পৃথিবীতে এঁকেছে তার উজ্জ্বল পদচারণা । জন্ম নিয়েছে বাংলা সাহিত্যের শত শত দিকপাল যাদের অমূল্য অবদানে বাংলা সাহিত্য আজ সমৃদ্ধ । বিশ্বের দরবারে পেয়েছে মর্যাদার সু-উচ্চ আসন । সেই বাংলা সাহিত্যের জন্ম বা ইতিকথা নিয়ে অনেক সাহিত্য বিশারদগণ অনেক গবেষণা করেন । প্রাচীনকাল থেকে প্রাপ্ত বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন গুলো বিশ্লেষণ করে তথা থেকে আজ অবধি বাংলা সাহিত্যের যে অপার সাফল্য গাঁথা রয়েছে, বাংলা সাহিত্য বিশারদগণ সময়ের আধিক্য ও সাহিত্যের বৈশিষ্টে্যর উপর ভিত্তি করে বাংলা সাহিত্য কে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন । সেই বিভাগ গুলোকে বাংলা সাহিত্যের যুগ-বিভাগ বলে। পরে সাহিত্যিকগণ বাংলা সাহিত্যের সুগ-বিভাগ কে তিনটি বিভাগে ভাগ করেছেন । প্রাচীন যুগ ; মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ । ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্তাব্দকে প্রাচীন যুগ ; ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে মধ্যযুগ আর ১৮০১ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সময়কে আধুনিক যুগ বলে অভিহিত করেন । এই মতামতটি বাংলা সাহিত্যের দিকপাল শ্রেষ্ঠ ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায় প্রদান করেন । দীনেশচন্দ্র সেন , সুকুমার সেন , গোপাল হালদার , মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখ এই মতবাতটি মেনে নিলেও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একটু ভিন্ন মত পোষণ করেন । তিনি মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ বিভাগকে সমর্থন করলেও প্রাচীনযুগ সম্পর্কে একটু ভিন্ন মত প্রদান করেন । ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে তিনি প্রাচীন যুগ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে তার এ মতটি প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি । এর একমাত্র কারণ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন থেকে প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের কোন কবিই এত আগে জন্মগ্রহন করেননি । যদিও তিনি তিব্বতি চর্যাপদ অনুসারে শবরপাকে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহন করেছেন বলে মনে করেন । সাহিত্যের এই যুগ বিভাগের ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে অন্ধকার যুগ বলা হয় । কেননা এ সময় তুর্কিরা বাংলা দখল করে নেয় । এর ফলে বাংলার আর্থিক , সামাজিক , রাষ্ট্রীয় , সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নতির বদলে বিপর্যয় নেমে আসে।এ জন্যই ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বাংলা সাহিত্যের বন্ধ্যা সময় বা অন্ধকার যুগ বলা হয় । তখন মানুষ জীবিকার তাগিতে দেশ ত্যাগেই ব্যস্ত ছিল । ফলে সাহিত্যে ধস নেমে আসে । আবার ১৭৬১ থেকে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে যুগ সন্ধির কাল বলা হয় । এই যুগ সন্ধির প্রধান পরিচায়ক ছিলেন বাংলা সাহিত্যের আরেক কালজয়ী দিকপাল ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর । 

সাহিত্য কথাটির মূলত জন্ম হয় “ সহিত ” শব্দ থেকে যার অর্থ “ মিলন ঘটানো।’’ এজন্যই পৃথিবী বরেণ্য কবি ও দার্শনিক , বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী মহাপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন-“ একের সহিদ অন্যের মিলনের মাধ্যমই হল সাহিত্য।” বাংলা সাহিত্যের আদি যুগের আদি গ্রন্থের নাম হল চর্যাপদ । চর্যাপদ মূলত একটি গানের সংকলন ছিল । বৌদ্ধ ধর্ম মতে চর্যাপদের পদ বা চর্যাগুলো বৌদ্ধ সহজিয়ারা লিখেছিল । সহজিয়া বলতে বৌদ্ধ সহজযান পন্থি বোঝায় । স্ব-দেহ কেন্দ্রিক সহজ পন্থায় সাধনা করতো বলেই এদেরকে সহজিয়া বলা হয় ।বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের বিস্তার প্রায় ছয় শতাব্দী বিস্তৃত যা শ্রীচৈতন্যদেবকে মধ্যখানে রেখে প্রাক চৈতন্য যুগ ও উত্তর চৈতন্য যুগে ভাগ করা হয় । কৃত্তিবাসের “ রামায়ণ” , চণ্ডীদাসের ‘‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ‘’ , মালাধর বসুর “ শ্রীকৃষ্ণবিজয়” , বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের “ বৈষ্ণবপদাবলী ” এবং তিনটি “মনসামঙ্গল কাব্য “ বিশেষ উল্লেখযোগ্য । উত্তর চৈতন্য যুগের রয়েছে বৃন্দাবনদাস , লোচনদাস , জয়ানন্দ এবং কৃষ্ণদাসের “ চৈতন্য-জীবন-কাব্য ” , জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের “ বৈষ্ণব পদাবলী” , কাশীরাম দাসের “মহাভারত” আলাওল ও দৌলতকাজীর কাব্যসম্ভার ও শাক্ত-পদাবলী ইত্যাদি । 

১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষা প্রবেশ করে আধুনিকযুগে । আখ্যানকাব্য , মহাকাব্য , নাটক , প্রহসন , গীতিকাব্য ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলা প্রবেশ করে বিশ্বের দরবারে। উপন্যাস , ছোটগল্প , রম্যরচনা ইত্যাদি আধুনিক রীতির কাব্যে বাংলা ভাষার সাহিত্য আজ শ্রেষ্ঠ সাহিত্য ভাণ্ডারে রুপ নিয়েছে । বঙ্কিমচন্দ্র  , শরৎচন্দ্র , সমরেশ বসু , মাইকেল মধুসূদন , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , সুকান্ত , জীবনানন্দ , শামসুর রাহমান , বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল , বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ সহ শত শত দিকপাল এই আধুনিক সাহিত্য যুগেরই । তাদের অমূল্য প্রতিভার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য আজ উত্তরাধুনিক যুগে পদার্পণ করে । সম্প্রতি নঅম চমস্কি , এডওয়ার্ড সেইড , মিশেল ফুঁকো প্রমুখের অনুপ্রেরণা অনুসারে ১৯৯০ এর পরবর্তী সময়কে উত্তরাধুনিকযুগ বলে অভিহিত করা হয় । যদিও বাঙ্গালি এখনো সম্পূর্ণভাবে আধুনিকই হতে পারেনি । 

এভাবেই ঋতুর পালাবদলের মত সময়ের হাত ধরে বাংলা সাহিত্য যুগ থেকে যুগে , আধুনিক থেকে উত্তরাধুনিকে রুপ ধারণ করে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে । যুগে যুগে কালে কালে এভাবেই বাংলা সাহিত্য তার উজ্জ্বল গৌরব নিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে অমলিন অম্লান হয়ে থাকবে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য