দর্পণ | দৈনিক ধারাবাহিক কলম | গল্প ~ পারিজাত ব্যানার্জী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


 স্বপ্ন বাড়ি 

পারিজাত ব্যানার্জী


স্বপ্নে বাড়ি তৈরি হয় না আমার। আশ্রয় জোটে। এমন আশ্রয় যার শরীরে নিজেকে সঁপে দিয়েই যেন মেলে শুধু চিরাচরিত শান্তি। যেই অন্দরে স্নেহে মাখামাখি করে কেটে গেছে আমার ছোটবেলা, সেই ঘরগুলোকেই দেখেছি ঘুরেফিরে সামান্য উল্টেপাল্টে ভাসতে সবসময় আমার চোখের সামনে, ঠিক যেন স্বপ্নমাখা কোনো পরিকাঠামো। 

পুরো ছোটবেলাটাই আমার কেটেছে গোলপার্কে একটা ভাড়া বাড়িতে। সেকেলে ধাঁচের বড় বড় সিঁড়ি পেরিয়ে তিনতলায় উঠে ছিল আমাদের তিন কামরার ফ্ল্যাট। বাড়িতে ঢুকতেই লম্বা আকাশ ছোঁয়া বারান্দার দুপাশ জুরে সব ঘর। বাইরের ঘরের আকাশি নীল রং করা দোলনাটা ছিল আমার নিজের একটুকরো জগৎ। সোফায় বসে মা টিভি দেখত, আর আমি কখনো দোলনা কখনও সোফার পিছনে লুকিয়ে নিজের মনে খেলতাম। পরে যখন বড় হয়ে যাই, দোলনা চলে যায় আমার ততদিনে ভুলে যাওয়া পুতুলদের দখলে - এ যেন দৃশ্যপট পাল্টে গেলেও রয়ে যাওয়া চেনা ছক। 

আর একটা আমার পছন্দের জায়গা ছিল লাল মেঝে দেওয়া খাওয়ার ঘরের বিশাল কাঠের টেবিল। ওতে আমরা কখনোই খেতে বসিনি অন্য কেউ নিমন্ত্রিত না হলে, তাই ওর উপর চড়ে ট্রেনে যাচ্ছি মনে করে কত যে দুপুর কেটেছে তার খবর আজ আর মনে রাখিনি। অবশ্য এটুকু ভাগ করে নেওয়াই যায়, লুকোচুরি খেলার জন্যও বেশ আদর্শ ছিল এই টেবিলটির তলার নিভৃত ছোট ঘর! 

যা হয়, বড় হওয়ার সাথে সাথে শোওয়ার ঘরের অন্দরেই নিজস্ব গণ্ডি কেটে বেশি করে থাকা শুরু করি আমি। যেখানে মনের মতোন করে নিরুপদ্রবে থাকা যায়, বাঁচার জন্য কোনো ভণিতার প্রয়োজন হয় না। বযঃসন্ধি এ এটুকু আড়াল যে রাখতেই হয়।

আর মনে আছে, যখন খুব কান্না পেত, সবার অলক্ষ্যে ঠাকুরঘরে চলে যেতাম। ঈশ্বর কি জানতাম না, আজও বুঝিনি, তবে অনুভব করতাম, এই একান্তে হালকা হওয়াটা খুব দরকার কখনওসখনও। 

২০১০ সালে আমরা সোনারপুরে নিজেদের কেনা ফ্ল্যাটে উঠে যাই। তারপর কিছু বছর গড়াতেই বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি। সেখানে থেকে আয়ার্ল্যাণ্ড, আর এখন অস্ট্রেলিয়া - এত বাসা বদল করেছি এই ক বছরে যে বিশেষ কোনো বাড়ি গড়ার আর স্বপ্ন আসেনা মন জুরে। স্বপ্নে ধরা দেয় থেকেথেকে আমার ছোটবেলা ওই হারানো নির্জন আশ্রয়টুকু শুধু - এটুকুই নাহয় রয়ে যাক হয়ে আমার ফেলে আসা চোদ্দ আনা সঞ্চয়!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ