দর্পণ || গল্প || তসলিম পাটোয়ারী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 

।।পরাজয়।।

।।তসলিম পাটোয়ারী।। 


সীমা ভীষণ খুশি বাবার ফোন পেয়ে। অবশেষে রীমার বিয়েটা পাকা হলো। খুশির সাথে সাথে সীমার কপালেও একটু ভাঁজ পড়লো। টাকা দিতে হবে বাবাকে, লাখখানেক। বাবা বলেছেন ধার। বাবা মেয়েতে আর ধার কী, সীমা বুঝে। বাবা রিটায়ার্ড মানুষ, টাকা পাবেন কোত্থেকে। তাকে বিয়ে দিয়েছেন একরকম নিখরচায়। কিন্তু এবার খরচ লাগবেই। ছেলেটা মানানসই, শিক্ষিত, চাকুরীজীবী। না চাইলেও কিছু দিতে হয়। সব বাবাই চান মেয়েকে সোনারূপায় মুড়িয়ে দিতে, ফার্নিচার ফিক্সার, প্লট ফ্ল্যাট দিতে, অভিজাত কম্যুউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান করতে। কিন্তু বাবার সে সাধ্য কই, যা পেরেছেন জোগাড় করেছেন, বাকিটা চেয়েছেন মেয়ের কাছে। 


টিচিং এও উতলা সীমা। সে বেঞ্চের পাশ দিয়ে হাঁটে, মেয়েদের মাথায় হাত বুলায়, উদাসীন ভাবে বলে, ভালো করে পড়ো, ভালো মানুষ হবে, দুনিয়া কঠিন, টিকে থাকতে হবে। নাইন টেনের ছাত্রীরা অতো আর কী বুঝে। ওদের মাথা ছোট, বুদ্ধিও ছোট। ছোট ছোট চাহনি দিয়ে ওরা ম্যাডামের দিকে চায়, বইয়ে মুখ গুঁজে, ম্যাডাম কাকে কখন কী ধরে বসেন সেই আতঙ্কে চোখ বুঁজে। 


সহশিক্ষিকারা বলেন, আপার সুখী সংসার, স্বামী স্ত্রী এক ছেলে এক মেয়ে, কী অতো ভাবেন আপা? সীমা গা ঝাড়া দেয়। যার মাথা তারই ব্যথা। এতো খাটাখাটি তবু সংসার যেন অসার, দু'জনের রোজগার তবু জেরবার। বাসা ভাড়া বেশি, ইউটিলিটি সার্ভিস চার্জ বেশি, দ্রব্য মূল্য বেশি, কুলিয়ে উঠা যায় না। হাসি আসেনা সীমার। সব হাসি সে বুঝি হেসে ফেলেছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। প্রাণ খুলে হাসবার, স্বাধীন ভাবে ভাববার, নতুন মত প্রকাশ করবার জায়গা ই তো বিশ্ববিদ্যালয়। ভাবতো ওরা বিশ্ব নিয়ে, নতুন নতুন তত্ত্ব নিয়ে। হাসতো নিজের জীবন নিয়ে, সহবাসী নিয়ে। রস করে বলতো, যখন অর্ধাঙ্গ হয়েই জন্মেছি, কী আর করা, পড়ে থাকবো ঋজুকায়; পূর্ণাঙ্গ নেচে যাবে তায়। 


শুধায় ওরা জাতীয় কবির কানে কানে, ওগো দ্রোহের কবি, সাম্যের কবি, তুমি যে বলো, 'জাগো মাতা কন্যা বধু জায়া ভগ্নি', বলি জাগবো কেমন করে। শাস্ত্রের কাছে হেরে আছি। তাই পড়ে আছি ঘোমটা পরে, বোরকা পরে, শাখা সিঁদুর পরে, কাঁকন চুড়ি পরে, চুলার পাশে, হেঁশেলের পাশে অনাদিকাল থেকে। কেন আর জাগাজাগি তবে, বাড়িওয়ালা ধরি, গাড়িওয়ালা ধরি, ঝুলে পড়ি, হোক সে রঙ্গ কিবা অনঙ্গ কিবা বুড়োশালিকের ঘাড়ে রোঁ। সীমা বলতো, তোদের সকলের হোক বাড়ি গাড়ি নামীদামী স্বামী, আমার হোক সাদামাটা জীবন, সরল সহগামী। বান্ধবীরা বলতো, জানি জানি, ভালো মানুষ পেয়ে গেছিস তো, রাজা রামমোহন রায় আর লর্ড বেন্টিংকও তোদের সহমরণ ঠেকাতে পারবেন না, ধন্য তোদের প্রেম। 


টিএসসিতে বড়ো বড়ো মানুষের বক্তৃতা শুনতে এসে শরীয়তপুরপুত্র হাসানের চোখে চোখ রাখে চাঁদপুরকন্যা সীমা। মেঘনার ভালোবাসায় যেমন প্লাবিত হয় শরীয়তপুর চাঁদপুর তেমনি চিরসুন্দর ভালোবাসায় প্লাবিত হয় ওরা। লনে ঘাসে তরু ছায়া তলে অভিসারে ওদের ওষ্ঠে ও অধরে থরে থরে বয় বৃন্দাবনের ঝড়। 


সেদিন বাম তাত্ত্বিকদের বক্তৃতা শুনে চায়ের আড্ডায় মেয়েরা চেপে ধরে ছেলেদেরকে, শুনলে, নারীর উপর তোমরা কী জোর খাটালে। সমাজ একসময় মাতৃতান্ত্রিক ছিলো, নারীরাই নিয়ন্ত্রণ করতো। এঙ্গেলস 'The Origin of the Family, Private Property and the State' এ বলেছেন, মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছে। তখন নারী-পুরুষে বৈষম্য ছিল না। তোমরা পুরুষরাই ভূসম্পত্তি দখল করেছো, গৃহের কর্তৃত্ব নিয়েছো, নারীকে করেছো দাসী, নারীর হয়েছে ঐতিহাসিক পরাজয়। 


খই ফোটায় মেয়েরা, বলো বলো, মর্গান কী বললেন বলো। ছেলেরা বলে হ্যা, এক বক্তা তো বললেন, হেনরি লুই মর্গান 'Ancient Society' তে বলেছেন, আদিম সমাজে সন্তান বড়ো হতো মায়ের নামে। নারী-পুরুষের মিলন ছিল অবাধ। পুরুষ জানতো না সন্তানের জন্ম রহস্য। পুরুষ মনে করতো  দৈবের বসে পূর্বপুরুষই শিশু হয়ে আসে নারীর পেটে। প্রসবের পরই পুরুষের সাথে শিকারে যাওয়া সম্ভব ছিল না নারীর। নারী কিছুকাল এক জায়গায় থেকে যেতো, সন্তান পরিচর্যার জন্য। এই সময় তারা দেখলো ঝরা ফল থেকে চারাগাছ হয়, শস্যদানা ছড়িয়ে রাখলে শস্য উৎপন্ন হয়। এভাবে নারীই সভ্যতায় আনলো কৃষিকাজ, স্থির নিবাস। 


মেয়েরা বলে উঠে, তবে কী ছেলেরা লাঙল জোয়াল টানার বলদ। অমনি হাসি আর হাসি, বাঁধ ভাঙা হাসি, উচ্চৈঃস্বরে হাসি। ছেলেরা বলে, এতো হেসো না, আমরা কী শিকার করে এনে তোমাদেরকে খাওয়াই নি? বেশ তো দেশে দেশে তবে তোমরাই হও কৃষিমন্ত্রী, দেখা যাবে। মেয়েরা বলে, তাতেও কী ছেড়ে দেবে তোমরা? তোমরা ফতোয়া দেবে, খনার মতো জিভ কেটে দেবে। দরকার নেই ভাই, খর্বাঙ্গ নিয়ে বাঁচা নয়, সর্বাঙ্গ ই দিয়ে দিলাম, শুধু সীমার মতো পেতে চাই ভালো মানুষের সঙ্গ । 


সীমার কাছে নারী পুরুষ কোন ভেদাভেদ নেই। সে মনে করে উভয়ের অবদান সমান। মনে করে সুন্দর যুগল থেকেই আসে পৃথিবী বদলানো সুন্দর মানুষ। তাই সুন্দর চিনতে হয়। সুন্দর নারীর সাথে হতে হয় সুন্দর পুরুষের রসায়ন। হাসান সুন্দর পুরুষ। সীমা তাই হাত রাখে হাসানের হাতে, ভাসায় জীবনতরী। 


কিন্তু সীমা ও হাসান পরাজিত হয় সংসারে এসে। সমাজ বদলের অঙ্গীকার করেছিল ওরাও। সংসারে এসে তা টুটে যায়। সুবিধা পেলে আন্দোলনকারী যেমন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আন্দোলন থেকে তেমনি সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অঙ্গীকার থেকে। কুসংস্কার তখন তাকে পুনঃ পেয়ে বসে। যে বিশ্বাস করতো ভূত নেই, সে বিশ্বাস করে ভূত আছে। যে মার্ক্সের মতো বলতো ধর্ম হলো opium of the people, সে হয় ধর্মপ্রাণ। সমাজের জন্য এরা কিছুই করতে পারেনা বরং এরা মান্ধাতা সমাজের অনুরত হয়ে যায়। সীমা ও হাসানও হয়। সংসারে তাদের একটু আধটু ঠোকাঠুকিও হয়। তবে ওরা একমত হয় যে, ওরা নিজ নিজ মত বলবে, গণতন্ত্রের শর্ত 'let us agree to differ' এর মতো। কিন্তু ঝগড়া হবে না, বড়ো করে কথা হবে না, বাচ্চাদের বুঝতে দেয়া হবে না কথা-কাটাকাটি হচ্ছে আব্বু আম্মুর মধ্যে। 


হাসান কোম্পানির চাকরি করে, সীমা করে বেসরকারি গার্লস হাইস্কুলে। তারা একটি বাসস্থানের আশা করে। তিল তিল করে টাকা জমায়। সে টাকা নানা ভাবে খরচও হয়ে যায়। চলে আবার জমানো। হাসান বলে আসছিল সীমাকে, প্লটের টাকাটা পরিশোধ হয়ে গেলে বাড়ির জন্য ব্যাংক ঋণের আবেদন করা যেতো। সে খোঁচা দেয় সীমাকে, শশুর মিয়ার টাকা খাবে কে, তোমরা তো সবে দুই কন্যাই। সীমার মনে হয়, হাসানের এই খোঁচা বুঝি প্রকারান্তরে বাবার কাছ থেকে কিছু আনতে বলা। রাতের নরম প্রহরে সীমা হাসানের চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলে, বাবার টাকা কই, ছোট চাকরি করতেন বাবা, অপেক্ষা করো, বাচ্চাদেরকে আগে মানুষ করি, বাড়ি একদিন হবেই। 


সীমা ও হাসান দু'জনেই ছুটে। হাসানকে ছুটতে হয় আগে। ধকলটা সীমারই বেশি। সে ঘরদোর সামলিয়ে বাচ্চাদেরকে নিয়ে ছুটে। স্কুল ছুটি হলে বাচ্চারা স্কুলের ডে-কেয়ার সেন্টারে থাকে। সীমা বিকালে ওদেরকে নিয়ে ফিরে। ছুটির দিন ছাড়া হাটবাজার হয় না ওদের। সপ্তাহ ধরে ওরা ফ্রিজের বাসী খাবার খায়। অবসর নেই কারোরই। তাই পৃথিবী চর্চাও কম ওদের। মনীষী ভেবলেন ঠিকই বলেছেন, ভাববার জন্য অলস সময় দরকার। যা হোক, অনেক দিন থেকেই একটা ছেলে খুঁজছিল তারা। হাসান গ্রামের বাড়ি গিয়ে পেয়ে যায় দুলালকে। নিজেদের ছেলে শান্ত'র চেয়ে একটু মাথা তোলা দুলাল। সে শান্ত ও ইতিকে স্কুলে দিয়ে আসতে পারে, নিয়ে আসতে পারে, হাটবাজার রান্নাবান্না সব পারে। অভাবে পড়ে হাত পাকিয়েছে সব কিছুতে। সীমা খুশি হয়। হাসান মজা করে বলে, একাউন্টিং কষে এনেছি, ফিলোসোফির মতো অনুমান করে নয়। 


দুলালের উপর দিনে দিনে মায়া বসে সীমার। নিজের বাচ্চাদের মতোই তাকে আম্মা বলে দুলাল। তফাৎ, বাচ্চারা নাড়িরটানে নির্ভয়ে বলে আম্মু আর দুলাল সভয়ে বলে আম্মা। হাসানদের গ্রামের বাড়িতে উড়ে এসেছিল দুলাল। হাসানের মা'র কাছে ছিল ক'মাস। মা ই বলেছেন, ছেলেটা ভালো, ওকে নিয়ে যাও। দুলাল ভবঘুরে উড়নচণ্ডী। লাফিয়ে উঠে ঢাকার কথা শুনে। সে বলে, তার বাড়ি ছিল চরতারাবুনিয়া, পদ্মায় খেয়ে ফেলেছে, মা-বাবা মরে গেছে, কেউ নেই তার। 


দুলাল সবার মন জুগিয়ে ফেলেছে। তার সাথে কাজের ছেলের মতো আচরণ করে না কেউ। সে যখন সীমাকে আম্মা বলে ডাকে তখন সীমার বুকেও মায়ের মতোই সুখ জাগে। সীমা নিজের বাচ্চাদের মতো ওকে কাছে টানে। ওকে প্রথমপাঠ এনে দেয়। শান্ত ও ইতি হয় ওর ওস্তাদ। ওর পরনে আসে সুন্দর সুন্দর প্যান্ট শার্ট। 


তবুও দুলাল কী যেন ভাবে। সীমার চোখে পড়ে তা। সেদিন রান্নাঘরে নিজেও পড়ে, কাপ প্লেটও ভাঙে। দুলাল ভয়ে জড়োসড়ো। সীমা শুধু বললো, হা রে দুলাল, তুই কী ভাবিস? দুলাল ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, আর ভুল অইতো না আম্মা। সীমা দুলালের মাথায় হাত রেখে বলে, এই ভাবে বলিস কেন? ভেঙেছে তো কী হয়েছে, তুই তো ঘরেরই ছেলে। 


পড়াশোনায় অনেক উন্নতি হয়েছে দুলালের। অল্প ক'দিনেই বর্ণমালা শিখেছে, নাম লিখতে পারে, রিডিং পড়তে পারে। কাগজ কলম নিয়ে শান্ত ও ইতির সাথেও টানাটানি হয়ে যায় কখনো। ভাইবোনের সমবেত নালিশ যায় মায়ের কাছে। সীমা দুলালকে শাসন করে চোখ টিপে। 


দুলালকে এতো আদর সোহাগ করা দেখে চোখ তোলে হাসান। সীমার অলখে সে মাঝেমধ্যেই একটু আধটু শাসায়ও তাকে। সীমাকেও বলেছে এতো আদিখ্যেতা ঠিক নয়, কোথাকার কোন উজবুক, শেষে ছোবল না দেয়। ওসব কথায় পাত্তা দেয়না সীমা। আজ পর্যন্ত ছেলেটার অমন কিছু দেখা যায়নি। বাজারের পয়সায় গড়বড় নেই, মিথ্যা বলে না, ভনিতা করে না। হাসানের মানিব্যাগ, নিজের পার্স, ড্রেসিং টেবিলেই পড়ে থাকে, এক পয়সাও খোয়া যায় না। আলমারির চাবি আলমারিতেই লাগানো থাকে, কিচ্ছু নড়ে না। খাওয়াদাওয়ায়ও কোন বদভ্যাস দেখা যায় না। সারাদিন ও ই তো ঘরে থাকে। ইচ্ছা করলে সব নিয়ে চলে যেতে পারে। 


সীমাও বকেনা, হাসানও না। তবুও মুখ কালো হয় দুলালের। রাতে দুলাল যখন সমান তালে চেয়ার টেনে শান্ত ও ইতির পাশে বসে বই নিয়ে, বোধ হয় হাসানের তখন ভালো লাগেনা। সহজাত অহংবোধে হয়তো হাসানও নিচে নেমে যায়। হাসান তখনই দুলালকে বলে এক গ্লাস পানি দিতে কিংবা পেপারটা, এটা ওটা দিতে। দেরি হলে ধমকায়। দু'দিন আগেও সে দুলালকে একটা জোর ধমক দিয়েছিল। দুলাল পানি এনে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারপরই সে লাপাত্তা হয়ে যায়। রাতের খাবার সাজাতে যখন ওর ডাক পড়ে তখন বেলকুনিতে ড্রয়িংরুমে বাথরুমে কোথাও পাওয়া যায়নি ওকে। 


সীমা ও হাসান মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। চার চোখে সন্দেহ। ধর্মঘটের পরে শিক্ষক বেতন বেড়েছিল। তাতে বকেয়া অনেক টাকা পেয়েছিল সীমা। সেখান থেকে এক লক্ষ টাকা রীমার বিয়ের জন্য রেখে দিয়েছিল। সীমা দ্রুত গিয়ে আলমারি খোলে। আছে টাকাগুলি, বিয়ের সময় দেওয়া মায়ের হাতের বালা দু'খানিও আছে। সীমা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। শান্ত হয়ে শেষে তারা খুঁজতে বেরোয় দুলালকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে পায় অনেক দূরে। আইল্যান্ডের লোহার বেড়ির গায়ে হেলান দিয়ে বসেছিল সে। তার আঁখিকোণে ছিল অশ্রুপাতের দাগ। 


ক'দিন পর শান্ত'র নানা আসেন। শান্ত ও ইতির সাথে দুলালও নানা বলতে মরিয়া। সে নানার সবকিছুর খবর রাখে, যা লাগে এগিয়ে দেয়। নানাকে ঘিরে ওরা আনন্দে মেতে উঠে। কিন্তু ধড়ফড় করে সীমার বুক। এই দফা খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে বাবাকে? অথচ বিয়ের দিন এলো বলে। সীমা সামনের সপ্তায় বাবাকে আসতে বলে। 


বাবা এসে হাজির হন। কী করবে সীমা! বলি বলি করেও হাসানকে কথাটা বলা হয়নি, হাসান যদি মুখ কালো করে ফেলে, যদি মানা করে বসে তাই বলা হয়নি। সীমার অস্থিরতা বাড়ে, মেজাজ বিগড়ে যায়। এদিকে স্কুলে আজ পরীক্ষা আছে। সে তৈরি হতে হতে ভাবে সে স্বাধীন নারী, তার অস্তিত্ব আছে, তার শ্রমের মূল্য আছে, নিজের শ্রমের টাকা তবুও কেন কথা বলতে হবে স্বামীর সাথে! আদিম স্বাধীন মাতৃতান্ত্রিকতার আলো লাগে তার চোখে। সীমা আলমারি খুলে তুলে নেয় টাকাগুলি এবং বালা দু'খানি, হাটতে শুরু করে ড্রয়িং রুমের দিকে। খোলা আলমারি হা করে চেয়ে থাকে তার দিকে। 


দুলাল তখনই ফিরে স্কুল থেকে। সে দাঁড়ায় নানা ভাইয়ের গা ঘেষে। সীমা চেচিয়ে উঠে, এই এইখানে কী? ওদিকে যা। দুলাল এই ধমককে ডরায় না। সে নানার জীর্ণ লেদার ব্যাগটা নাড়াচাড়া করছিল আপন মনে। সীমা আবারো বললো, যা তো এখান থেকে। দুলাল এবারও নড়ে না। সীমা মেজাজ ধরে রাখতে পারলো না। সে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলো দুলালের গালে। দুলাল একটুও কাঁদলো না। কাঁদবে কেন? দুলাল যে কাজের লোক, শুদ্র। মনু বলেছেন, ওরা পাবে এঁটো ভাত, পরবে ছেঁড়া কাপড়, শোবে ছেঁড়া মাদুরে। এরিস্টটল বলেছেন, ওদের জন্ম হয়েছে মুখ বুঁজে কাজ করার জন্য। দুলাল বুঝতে পারলো এ ঘরে সে কাজেরই ছেলে। সে আশ্রয়দাত্রী অন্নদাত্রী আম্মার দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। আম্মার চোখে তখনো আগুন। সে আগুনে পুড়ে সে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। 


বাবাকে বিদায় দিয়ে তাড়াহুড়া করে সীমা। বেরিয়ে  পড়ার চেষ্টা করে কোনোমতে। কিন্তু দুলাল নেই। সীমা ভাবলো যেখানেই থাকুক রাগ পড়লে চলে আসবে। সে দরজার গোল ডোরনবটা ধরে দরজাটা আলতো করে টেনে রাখে। এ কৌশল হাসান আর দুলালের জানা। 


বিকালে বাসায় ফিরে হাসানকে দেখে চমকে উঠে সীমা। ওর ফিরার কথা ছিল না। এক সপ্তাহ চাটগাঁ থাকার কথা ছিল। সীমা ভাবলো হয়তো কাজ সেরে গেছে কিংবা প্রোগ্রাম বদলেছে। কখন ফিরলে, জিজ্ঞেস করতেই হাসান ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠে, সময় মুখস্থ রেখেছি নাকি? জবাব শুনে সীমা স্তম্ভিত। হাসান নেশাগ্রস্ত লোকের মতো চোখ বড়ো বড়ো করে বললো, বলি তোমার আলালের ঘরের দুলাল কই? সীমা উদ্বিগ্ন হয়ে বললো, কেন? ফিরেনি? হাসান বললো, ফিরবে কেন? পালিয়ে গেলে কেউ ফিরে? বলেছিলাম না এতো আদর দিও না, একদিন ফণা তুলবে? প্রতিদিন কাগজে দেখো এসব অথচ মাথায় রাখোনা? আমি এসে দেখি আলমারিটা খোলা, তখনই সন্দেহ হলো, গিয়ে দেখি তোমার বাক্স খালি, টাকা পয়সা কিচ্ছু নেই, ভাগ্য ভালো যে নিচের ড্রয়ারটা খোলেনি, তাইলে আমার টাকাগুলিও যেতো। কিন্তু ও কখন করলো এ কাজ, ওদেরকে স্কুল থেকে এনে গোসল করিয়ে খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে তারপর? 


সীমার চোখ ছলছল। বুকের ভেতরটা চিন চিন করে উঠে। সে আঁচলে মুখ ঢাকে। ইতি বললো, আম্মু দুলাল ভাইয়া কোথায় গেছে? মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে সীমা বললো, যায়নি, ও আসবে। চেঁচিয়ে উঠে হাসান, হুহ বয়েই গেছে আসতে। হাসানের কথাগুলো তীরের ফলার মতো বিঁধে সীমার বুকে। সে ফ্লোরের দিকে চেয়ে চোখ মুছে। তার মাতৃসত্ত্বা জেগে উঠে। হ্যা, সত্য তাকে বলতেই হবে, বলতেই হবে দুলাল ওসব করেনি। সীমা আপন দক্ষিণ হস্ত তুলে ধরে চোখের সামনে। হস্ত থেকে সমস্ত অন্তর জুড়ে এ যেন বিরাট এক কালসাপ, কুঞ্চিত পঞ্চআঙুলের মুদ্রায় তার ফণা। ঘৃণায় আক্রোশে হাতকে সোফায় আছড়াতে থাকে সীমা। আছাড়ে আছাড়ে লুটিয়ে যায় ফণা, রক্ত ছুটে আঙুল ফেটে। হাসান মুহূর্তে সীমার হাতখানি ধরে ফেলে বললো, একি করছো পাগলের মতো, গেলে গেছে সামান্য জিনিস, এমন তো নয় যে, সাত রাজার ধন। সীমার অশ্রু তবু থামেনা। সে কান্না করে বলে উঠে, আমি অন্যায় করেছি, দুলালকে মেরেছি হাসান, শোন তবে..। 


সব শুনে হাসান বললো, আচ্ছা সীমা, রীমা কী আমার ছোট বোন নয়? আমাকে একটুও সহযোদ্ধা ভাবলে না, বাবাকেও চাপে ফেললে! এটা ঠিক হলো? তোমার আমার সম্পর্ক এই! 


হাসান সীমার আঙুলে ফাস্টএইড লাগিয়ে সীমার হাতের পিঠখানি তার ঠোঁটের কাছে নিয়ে একটুকরো চুমু দিয়ে বললো, রেস্ট করো, আমি দেখছি ছেলেটাকে। 

---

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ