দেহতত্ত্ব কথা ও কামসূত্রের রূপ ~ দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

আমাদের জীবনটা বড় অস্থির, ঘটনা - দিনপঞ্জি প্রতিদিন ভিন্ন | কিন্তু জীবনের সঠিক উপলব্ধি খুব কম মানুষের কাছে প্রভাবশালী | প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে জীবনধারার নানা রকম গবেষণা এবং লেখালেখি হয়েছে | এই বিষয়ে বাৎস্যায়ন এর কামসূত্র কিংবা লালন সাঁই এর জীবন দর্শণ বোধ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ |


 ❑ লালন ফকিরের দেহতত্ত্ব 

দেহ তত্ত্বই বাউল সম্প্রদায়ের মূল ভিত্তি। দেহই সকল রহস্যের মূল। দেহকে দেখার অর্থ দেহকে পাঠ করা বা আত্মদর্শন করা। আপনাকে জানার মাধ্যমে পরম সত্তার অস্তিত্ত্ব জানা যায়। লালন পরমাত্মাকে উপলব্ধি করেছেন আপন অস্তিত্ত্বের মধ্যে এবং বিশ্বাস করেছেন , অস্তিত্ত্বের রহস্য গভীরভাবে ও একনিষ্ঠভাবে দেখলে , পাঠ করলে ও আত্মদর্শন করলে অচেনার সাথে সংযোগ হতে পারে। তাই সত্যকে জানা ও পাওয়ার মাঝখানে একমাত্র দেহকেই অবলম্বন করেছেন পরম প্রাপ্তির উদ্দেশ্য সাধনের জন্য।


সাইঁজী লালনের মতে আধ্যাত্মিক পরিকল্পনা দেহত্বকে ছুঁয়ে যায়,  কাম - ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আত্মাকে জানা ও পরমাত্মার সাথে সংযোগ স্থাপন, বাউলের মূল ধারা |


মনের সাধনার শক্তি সম্পর্কে লালন আরো বলেছেনঃ 

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।


এখানে দেহ হল খাঁচা আর মন হল পাখি । দেহতত্ত্বের এসব নিগূঢ় রহস্য জানতে লালন নিয়ে ব্যাপক গবেষনার প্রয়োজন আছে । 


 ❑ বাৎস্যায়নের কামসূত্র :


কামসূত্র সম্পর্কে আমাদের সাধারণ যে ধারনা রয়েছে অশ্লীল উপলব্ধি আদতে কিন্তু তা নয়, কামসূত্র কর্মসূত্র বলা যায় | ভারতবর্ষে ‘কাম’ ও ‘কর্ম’ শব্দে একসময় কোনো অর্থভেদ ছিল না। উপমহাদেশের কোনো কোনো ভাষা এখনো এই অর্থসম্পর্ক বহন করে। কামশাস্ত্র বা কামসূত্র বলে চিহ্নিত শাস্ত্রগ্রন্থটি আদপে ছিল বিস্তারিত সমাজকর্মব্যাখ্যান, অর্থাৎ পরিপূর্ণ এক ব্যবস্থাপনা শাস্ত্র, অধুনাকার যৌনশাস্ত্র মাত্র নয়। কিন্তু ভাষার বিবর্তনে বহুঅর্থব্যঞ্জক কামশাস্ত্র অর্থগত ব্যাপ্তি হারাতে হারাতে একার্থক সেক্সোলজিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

এখানে বাৎস্যায়ন প্রণীত ‘কামসূত্র’ সম্পর্কে কিছু তথ্য সন্নিবিষ্ট হল, যেগুলি গ্রন্থটি সম্পর্কে ভুল ধারণা ভাঙতে সাহায্য করতে পারে।


১. ‘কাম’-এর অর্থ ‘বাসনা’। বাসনাশূন্য জীবন অসম্ভব। আধ্যাত্ম বাসনাও বাসনাই। সেক্ষেত্রে ‘কামসূত্র’ আত্মোপলব্ধি কথাই বলে।


২. সমগ্র ‘কামসূত্র’-এর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ যৌনতার কথা বলে।


৩. ‘কামসূত্র’-এ ১২৫০টি শ্লোক রয়েছে। শ্লোকগুলি ৩৬টি অধ্যায়ে গ্রথিত। সমগ্র গ্রন্থটি ৭টি পর্বে বিন্যস্ত।


৪. ‘কামসূত্র’ বাৎস্যায়নের এককভাবে লিখিত গ্রন্থ নয়। বরং বলা য়েতে পারে, বাৎস্যায়ন একজন সংকলক। তাঁর পূর্বে ‘কাম’ বিষয়ে যেসব দার্শনিকরা সন্দর্ভ রচনা করে গিয়েছেন, বাৎস্যায়ন সেগুলিকেই সংকলিত করেন। এই লেখদের মধ্যে দত্তক, সুবর্ণাভ, গণিকাপুত্র, কুচুমার প্রমুখ রয়েছেন। 


৫. ‘কামসূত্র’-এর মুখ্য বক্তব্য— পুরুষার্থগুলির মধ্যে ‘অর্থ’ অপেক্ষা ‘ধর্ম’ শ্রেয়তর। সেই কারণেই এই গ্রন্থ কামনা-বাসনায় জর্জরিত জীবন থেকে মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়।


৬. ‘ধর্ম’ ও ‘অর্থ’-এর মতো ‘কাম’-ও প্রাত্যহিক জীবনে কার্যকর একটি বিষয়। কেবল চতুর্থ পুরুষার্থ ‘মোক্ষ’-ই কর্মফল ও জন্মান্তর চক্র থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে।


৭. ‘তান্ত্রিক সেক্স’ বলে যে বিষয়টিকে পশ্চিমি দেশগুলি প্রচার করে, তার সঙ্গে ‘কামসূত্র’-এর কোনও সম্পর্ক নেই।


৮. ‘কামসূত্র’-এর একটি বড় অংশ মানব মনস্তত্ত্ব নিয়ে কথা বলে।


কামশাস্ত্র সাহিত্যধারার প্রাচীনতম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হল কামসূত্র।হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে শিবের দ্বাররক্ষক নন্দী কামশাস্ত্রের আদিরচয়িতা। তিনি শিব ও তাঁর পত্নী পার্বতীর রমণকালে উচ্চারিত পবিত্র বাণী শুনে মুগ্ধ হন। পরে মানবজাতির কল্যাণার্থে সেই বাণী লিখে রাখেন।

কোনো কোনো ভারতীয় দার্শনিক পুরুষার্থনামক জীবনের চার উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন:


(১) ধর্ম: ধার্মিক জীবন, (২) অর্থ: আর্থিক সমৃদ্ধি, (৩) কাম: নান্দনিক ও যৌন আনন্দ লাভও (৪) মোক্ষ: আধ্যাত্মিক মুক্তি।


ধর্ম, অর্থ ও কাম দৈনন্দিন জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু মোক্ষ জন্ম ও পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তিলাভ। কামসূত্র গ্রন্থে লিখেছে:


“ধর্ম অর্থ অপেক্ষা শ্রেয়, অর্থ কাম অপেক্ষা শ্রেয়। কিন্তু অর্থই রাজার জীবনে প্রথম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। কারণ কেবল ইহা হতেই প্রজাগণ জীবনধারণ করিবেন। পুনরপি, কাম বেশ্যাদিগের উপার্জনপথ এবং তাহারা অন্য দুই অপেক্ষা ইহাকেই বাছিয়া লয়। ইহা সাধারণ নিয়মের ব্যতয়।”


বাৎস্যায়নের মতে, শিশুকালেই এক ব্যক্তির অর্থোপার্জনের উপায় শিক্ষা করা উচিত। যৌবন আনন্দ উপভোগের কাল। বয়স অতিবাহিত হলে তাঁর ধর্মকর্মে মনোসংযোগ করে মোক্ষলাভের উপায় চিন্তা করা উচিত।


গৌতম বুদ্ধও একটি কামসূত্র শিক্ষা দিয়েছেন। এটি অত্থকবগ্গ গ্রন্থের প্রথম সূত্রে পাওয়া যায়। এই কামসূত্র অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এখানে বুদ্ধ ইন্দ্রিয়সুখের অনুসন্ধান কত ভয়ানক হতে পারে তা শিখিয়েছেন।


_______________

তথ্যসূত্র সংগৃহীত 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ