নবযুগের পথিক সুভাষ মুখোপাধ্যায় ~ তৈমুর খান




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

যে কবিকে খুব কাছের মনে হত, যে কবিকে মেহনতী মানুষের কবি হিসেবেই চিনতে শিখেছিলাম, মিছিলের স্লোগানে যে কবির কথা খুব মনে পড়ত, তিনি যে সুভাষ মুখোপাধ্যায় এ কথা অনেকেই জানেন। এক্সপ্ল্যানেড ময়দান থেকে যখন মিছিল নিয়ে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়তাম, মুষ্টিবদ্ধ হাত যখন মাথার ওপর দিকে উঠে যেত, তখন নিজেকেই ‘মিছিলের মুখ’ মনে হত। সমস্ত ছাত্রকাল ধরে যাঁর কবিতা পড়ছি,যাঁর কবিতার বাঁকে বাঁকে জীবনের গতিময় এক সাবলীল পথের সন্ধান পাচ্ছি তিনি তো প্রিয় কবি হয়ে উঠবেনই একথা বলাই বাহুল্য। আজকেই তাঁর জন্মদিন, অনেকদিন পর আবার তাঁর কবিতার সামনে বসলাম।

 ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারি নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে মামার বাড়িতে সুভাষ মুখোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতামাতার নাম যথাক্রমে ক্ষিতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও যামিনী দেবী। পিতার আবগারি বিভাগে বদলির চাকরির সুবাদে কবির ছেলেবেলা কাটে যাযাবরের মতো। প্রথমে উত্তর বাংলার মহাকুমা শহর নওগাঁর স্কুলে, তারপর কলকাতার মেট্রোপলিটন, সত্যভামা ইনস্টিটিউশন এবং ভবানীপুর মিত্র স্কুলে পড়াশোনা করে বিভিন্ন সময়ে ভর্তি হন আশুতোষ কলেজ, স্কটিশচার্চ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ায় পড়াশুনা অসমাপ্তই থেকে যায়। এই সময় সাহিত্যরসিক শিক্ষক হিসেবে তিনি কাছে পান কবি কালিদাস রায়, ‘কালি ও কলম’ পত্রিকার সম্পাদক মুরলীধর বসুকে এবং বন্ধু রূপে গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রমানাথ রায়, পরিমল সেনগুপ্ত, রামকৃষ্ণ মৈত্র প্রমুখ ব্যক্তিদের। পরবর্তী জীবনের সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন কবি বিষ্ণু দে, সমর সেন, বুদ্ধদেব বসুকে এবং কারাবাসের সময় আব্দুর রজ্জাক খান, সতীশ পাকড়াশী, পারভেজ শহীদী(উর্দু সাহিত্যিক), চারু মজুমদার, গিরিজা মুখার্জী, চিনমোহন সেহানবীশ প্রমুখ স্বনামধন্য মানুষদের।

   সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনও নানা টানাপোড়নের মধ্য দিয়ে কাটে। বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্ন ঘটনাবলীর সঙ্গে মুক্ত হয়ে পড়েন। সাল অনুযায়ী একটা উল্লেখ্যপঞ্জি দেওয়া যায়:

১৯৩২-৩৩-এ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কিশোর ছাত্রদলের সক্রিয় সদস্যরূপে যোগদান।

১৯৩৯-এ লেবার পার্টির সঙ্গে সংযুক্ত একই কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আকর্ষণ বোধ।

১৯৪২-এ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ। একই সময়ে ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক শিল্পী-সংঘের সংগঠন কমিটিতে বিষ্ণু দে-র সঙ্গে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত। মাসিক ১৫ টাকা ভাতায় সর্বক্ষণের কর্মীরূপে পার্টির ‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকায় যোগদান।

১৯৪৬-এ ‘নৈতিক স্বাধীনতা’ পত্রিকার সাংবাদিকতা।

১৯৪৮-এ মার্চে কমিউনিস্ট পার্টির বে-আইনি ঘোষণার ফলে কারাবরণ। দমদম জেলে হাঙ্গার স্ট্রাইক।

১৯৫০-এ নভেম্বরে কারা থেকে মুক্তি এবং ৭৫ টাকা বেতনে একটি নতুন প্রকাশনা সংস্থার সাব এডিটর।

১৯৫১-এ ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব। এই বছরই গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিবাহ।

১৯৫২-এ বজবজে সস্ত্রীক ব্যঞ্জনবেড়িয়া গ্রামের মজদুর বস্তিতে থেকে চটকল মজুর সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ। পরে কলকাতায় পোর্ট অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়নের কাজে যোগদান।

১৯৬৭-তে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে দ্বিতীয়বার কারাবরণ এবং ১৩ দিন কারারুদ্ধ।

১৯৭০ থেকে রাজনৈতিক চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটে। নকশাল আন্দোলন সমর্থন করেন না বলে ‘কে কোথায় যায়’ উপন্যাস লিখে বিপক্ষে মত দেন।

১৯৭৭-তে জরুরি অবস্থাকে সমর্থন করেন। এ্যাফ্রো-এশিয়ান লেখক সমিতির কাজে জড়িয়ে পড়েন বলে ট্রেড ইউনিয়নের কাজ থেকে সরে আসেন।

১৯৮১-তে পার্টির সদস্য পদ থেকে মুক্তি লাভ এবং বামপন্থী রাজনীতি পরিত্যাগ।

       সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে অজস্র রচনা করে চলেছেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

কাব্যগ্রন্থ: পদাতিক(১৯৪০), অগ্নিকোণ(১৯৪৮), ফুল ফুটুক(১৯৫৭), চিরকুট(১৩৫৭ বঙ্গাব্দ), সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা(১৩৬৪ বঙ্গাব্দ), যত দূরেই যাই(১৩৬৯ বঙ্গাব্দ), কাল মধুমাস(১৯৬৬), শ্রেষ্ঠ কবিতা(১৯৭০), এই ভাই(১৯৭১), ছেলে গেছে বনে(১৯৭২), সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্য সংগ্রহ(প্রথম ও দ্বিতীয়: ১৩৭৯ ও ১৩৮১ বঙ্গাব্দ), একটু পা চালিয়ে ভাই(১৯৭৯), জল সইতে(১৯৮১), চইচই চইচই(১৯৮৩), বাঘ ডেকেছিল(১৯৮৫), যারে কাগজের নৌকা(১৯৮৯), ধর্মের কল(১৯৯১) প্রভৃতি।


অনুবাদ কাব্য:

নাজিম হিকমতের কবিতা(১৯৫২), দিন আসবে(নিকোলো ভাপৎ সারভ, ১৩৭৬ বঙ্গাব্দ), পাবলো নেরুদার কবিতাগুচ্ছ(১৩৮০ বঙ্গাব্দ), ওলঝাস সুলেমেনভ-এর রোগা ঈগল(১৩৮০ বঙ্গাব্দ), নাজিম হিকমতের আরো কবিতা(১৩৮৬ বঙ্গাব্দ), পাবলো নেরুদার আরো কবিতা(১৩৮৭ বঙ্গাব্দ), হাফিজের কবিতা(১৯৮৪), চর্যাপদ(১৯৮৬), অমরুশতক(১৯৮৮) প্রভৃতি।


ছড়া:

মিউ-এর জন্য ছড়ানো ছিটানো(১৯৮০)।


রিপোর্টাজ ও ভ্রমণ কাহিনি:

আমার বাংলা (১৯৫১), যখন সেখানে(১৩৬৭ বঙ্গাব্দ), ডাকবাংলার ডায়রি(১৩৭২ বঙ্গাব্দ), নারদের ডায়রি(১৩৭৬ বঙ্গাব্দ), যেতে যেতে দেখা(১৩৭৬ বঙ্গাব্দ), ক্ষমা নেই(১৩৭৮ বঙ্গাব্দ), ভিয়েতনামে কিছুদিন(১৯৭৪), আবার ডাকবাংলোর ডাকে(১৯৮৪), টোটো কোম্পানি(১৯৮৪), এখন এখানে(১৯৮৬), খেলা হাতে খোলা মনে(১৯৮৭) প্রভৃতি।


অর্থনীতিমূলক রচনা:

মার্কসের ‘ওয়েজ লেবার এ্যান্ড ক্যাপিটাল’ অবলম্বনে ‘ভূতের বেগার’(১৯৫৪)।


অনুবাদমূলক রচনা:

‘যত ক্ষুধা’ ভবানী ভট্টাচার্যের So many Hungers উপন্যাসের অনুবাদ (১৯৫৩), রোজেনবার্গ পত্রগুচ্ছ(১৯৫৪), ‘ব্যাঘ্রকেতন’—সুভাষচন্দ্র বসুর কর্ম ও জীবনের অনুবাদ রুশ গল্প সঞ্চয়ন(১৯৬৮), ‘ইভান দেনিসোভিচের জীবনের একদিন’(১৯৬৮), চে গেভারার ডায়রি (১৯৭৭), শের জঙ্গের Tryst with Tiger অবলম্বনে ‘ডোরাকাটার অভিসারে’(১৯৬৯), আনাফ্রাঙ্কের ডায়রি(১৯৮২), ভীম সাহানীর রচনা ‘তমস’-এর অনুবাদ (১৩৯৫ বঙ্গাব্দ) প্রভৃতি।


কবিতা বিষয়ক গদ্য:

কবিতার বোঝাপড়া, টানাপোড়নের মাঝখানে।


উপন্যাস:

হাংরাস(১৯৭৩), কে কোথায় যায়(১৯৭৬)।


জীবন:

জগদীশ চন্দ্র(১৯৭৮), আমাদের সবার আপন ঢোল গোবিন্দের আত্মদর্শন(১৯৮৭), ঢোল গোবিন্দের মনে ছিল এই।


শিশু ও কিশোর উপযোগী রচনা:

ড. নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’(আদি পর্ব)-এর সংক্ষিপ্ত কিশোর সংস্করণ(১৯৫২), ‘অক্ষরে অক্ষরে’ আদিপর্ব(১৯৫৪), কথার কথা(১৯৫৪), দেশ-বিদেশের রূপকথা(১৯৫৫), বাংলা সাহিত্যের সেকাল ও একাল(১৯৬৭), ইয়াসিনের কলকাতা( ১৯৭৮) প্রভৃতি।


সুভাষ মুখোপাধ্যায় বেশ কয়েকটি গ্রন্থ সম্পাদনও করেছেন। এছাড়া তাঁর কবিতা সংগ্রহ চার খণ্ড এবং গদ্য সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা:

এমন একটি সময়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাহিত্য আকাশে উদিত হলেন যখন চারিদিক ধ্বংসময়তায় আচ্ছন্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা জনমানসে আতঙ্কের শিহরন তুলেছে। মানুষের জীবন, স্বপ্ন অনিশ্চয়তায় হাবুডুবু খাচ্ছে। সংগ্রাম শিথিল হয়ে পড়েছে। ফ্যাসিবাদের উত্থান শোষণ-পীড়নের নখদন্তকে আরও নগ্ন ও তীক্ষ্ণ করে চলেছে। মানুষ বিপন্ন, অসহায় হয়ে মৃত্যুর দিন গুনছে। ঠিক এই মুহূর্তেই বাইরের ধ্বংস আর ভেতরের বিষণ্ণতাকে কাঁপিয়ে সুভাষের পদধ্বনি শোনা গেল। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক-মজদুরদের মিলিত কন্ঠে তিনি সকলকে যেন চাবুক মারার মতো ডাক দিলেন:

“প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,

দুর্যোগে পথ হয় হোক দুর্বোধ্য

চিনে নেবে যৌবন-আত্মা।।”

শতাব্দী লাঞ্ছিত আর্তের কান্না বেজে উঠছে। মৃত্যুর ভয়ে বসে থাকা সাজে না। ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। যতই দুর্যোগ আসুক আমরা এগিয়ে যাব—এই আমাদের সংকল্প। সমাজ ভেঙেছে তাতে কোনো দুঃখ নেই। সেই ভাঙনের ভেতর দিয়েই নতুন সমাজের আগমন সূচিত হয়েছে। কবি সেই আগমনকে ত্বরান্বিত করে বললেন:

“কমরেড, আজ নতুন নবযুগ আনবে না?

কুয়াশাকঠিন বাসর যে সম্মুখে।

লাল উল্কিতে পরস্পরকে চেনা-

দলে টানো হতবুদ্ধি ত্রিশঙ্কুকে,

কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?”

নবযুক্ত আসবেই—এই বিশ্বাস আর সংগ্রামের মন্ত্র তাঁর কবিতা। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, শিরদাঁড়া টানটান করে শত্রুর মোকাবিলা, বেঁচে থাকার প্রবল বাসনার ঝংকার—সমস্ত নৈরাশ্যকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চাইলেন। দৃপ্ত আর দীপ্ত ভঙ্গিতে প্রাণের প্রগলভতায় শপথ নিলেন:

“হতাশার কালো চক্রান্তকে ব্যর্থ করার

শপথ আমার; মৃত্যুর সাথে একটি কড়ার—

আত্মদানের, স্বপ্ন একটি পৃথিবী গড়ার।”

সমর সেনের মতো সাম্যবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত হলেও সুভাষ মুখোপাধ্যায় নৈরাশ্যবাদী নন, পলায়নবাদীও নন— সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি সমস্ত অধিকার আদায় করে নিতে চান। তিনি শোষক বুর্জোয়া সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাই শ্রমিক, কৃষক, মজদুরদের নিয়ে সংগঠন করেছেন, দল গড়েছেন। মার্কসবাদে আস্থা রেখে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। কারাবরণও করেছেন। ব্যাপকতর বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর কবিতায় যতটা বৈদগ্ধ্যের পরিচয় পাই, নজরুলীয় উগ্র উচ্ছ্বাস ততটা নেই। অন্ধ আবেগের পথ তাঁর নয়। জীবনকে মেপে মেপে, জীবনের ভাঙাচোরা টোলপড়া অবয়বকে তিনি দাঁড় করাতে চেয়েছেন। সেখানে এনে দিয়েছেন সারল্যের সঙ্গে প্রজ্ঞার অভিব্যক্তি। শব্দে, আঙ্গিকে, প্রকরণে আজও তাঁর স্বতন্ত্রতা চোখে পড়ে। দুর্ভিক্ষ আর দারিদ্র্যের ছবি ফোটাতে তাঁর কাছে মাত্র কয়েকটি শব্দই যথেষ্ট:

“হাত পাতবো কার কাছে

গাঁয়ে সবার দশা এক

তিন সন্ধ্যে উপোস দিলাম

আজ খাচ্ছি বুনো শাক।”

কিন্তু এই বেঁচে থাকার মধ্য দিয়েও জীবনের আশ্বাস খুঁজে পেয়েছেন। দাবি আদায়ের মিছিলে স্পন্দিত হয়েছেন। সারা কলকাতা শহরই আন্দোলিত হয়েছে। মিছিলে একটা শপথ দৃঢ় মুখ, মুষ্টিবদ্ধ শানিত হাত উপরে উঠতে দেখেছেন। যতই হাড় জিরজিরে গাছ পাতা ঝরিয়ে শেকড় বের করে ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকুক, যতই আইবুড়ো কালো কুচ্ছিৎ মেয়ে রেলিঙে ভর দিয়ে কারও জন্য অপেক্ষা করুক—কবি হরবোলা একটি ছেলের সিটি বাজানোর শব্দের সচকিত হয়ে এসবের মাঝেও ঘোষণা করে দেন:

“ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।”

কবি জানেন যতই অন্তরায় থাকুক, যৌবনের দীপ্ত সংরাগ ফুল হয়ে ফুটবেই। তাই পাতা ঝরা গাছও হেসে উঠবে:

“শান-বাঁধানো ফুটপাথে

পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ

কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে

হাসছে।”

জীবন যে স্বপ্নহীন নয়, জীবন যে বসন্তহীন নয় কবি তা বোঝাতে চাইলেন।

    সুভাষ মুখোপাধ্যায় একই রাজনৈতিক মতাদর্শে চিরদিন নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। তাই সেখান থেকেও একদিন সরে এসেছেন। বয়সের ধর্ম, অভিজ্ঞতার গাঢ়তা, ব্যক্তিগত হতাশা, বিরক্তি, ক্ষোভ, জ্বালা, অসহিষ্ণুতা কবিকে নিঃসঙ্গ, একা করে দিয়েছে কখনো কখনো। প্রকৃতি, সামাজিকতা, রাজনীতি আর সংগ্রামের জোশ ফিকে হয়ে গেছে তখন। ফুলের মালা, আর সঙ্গী সাথীদের সংগ্রামী শুভেচ্ছাও ভালো লাগেনি। তখন লিখেছেন:

“ফুলগুলো সরিয়ে নাও,

আমার লাগছে।

মালা জমে জমে পাহাড় হয়

ফুল জমতে জমতে পাথর।

পাথরটা সরিয়ে নাও,

আমার লাগছে।”

গভীর অভিমানে সরে দাঁড়াতে চেয়েছেন, যেখানেই দেখেছেন স্বার্থসিদ্ধির নানা কৌশল,  অমানবিকতার ফন্দি-ফিকির সেখান থেকেই নির্বাসন চেয়েছেন। তাই প্রকৃতিকেও সে-কথা জানিয়ে লিখেছেন:

“ও মেঘ

ও হাওয়া

ও রোদ

যাচ্ছি”

কিন্তু এই যাওয়ার মধ্যে কবির অভিমান থাকলেও মানুষের প্রতি বিশ্বাস কখনো হারাননি। মানুষকে ভালোবাসার কথা কখনো ভুলতে পারেননি। সংগ্রাম কবির রক্তে বারবার বেজে উঠেছে। তাই আবারও লিখেছেন:

“আজও দুবেলা পথে ঘুরি

ভিড় দেখলেই দাঁড়াই

যদি কোথাও খুঁজে পাই মিছিলের মুখ।”

আমরা সেই মিছিলের কবিকে, সেই মানুষের কবিকে, সেই জীবনের কবিকে, সেই পথের কবিকে কখনো ভুলে থাকতে পারি না। আমাদের জীবন-যাপন আর নিত্যদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা-অশ্রু বিসর্জন-স্লোগানে এবং একান্ত নিভৃত আলাপেও তাঁর কবিতার কাছে উত্তাপ খুঁজে পাই। বাঁচা, বাঁচতে চাওয়া, যৌবনের আর্তনাদের মধ্যেও তাঁর কবিতার ভাষা আমাদের ভাষা হয়ে মুক্তি দিতে পারে। একই সঙ্গে ক্লান্তি আর ক্লান্তি দূর করার মন্ত্র, সাম্যবাদী চেতনায় নিরলস আস্থা রেখে আজও আমরা নবযুগের পথ চেয়ে বসে থাকি। 

আসুন তাঁর জন্মদিনে আজ তাঁকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ