গাছের মাস্তুলে পাখি || অংশুমান কর




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

গাছের মাস্তুলে পাখি
অংশুমান কর
একটি কবিতায় শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, “কবিতায় যদি গল্প লুকোনো থাকে, /টপ করে তাকে গিলে নেবে সিরিয়াল”। তবে এই দু’টি পঙ্‌ক্তি পড়ে যদি এমনটা মনে করা হয় যে, কবিতায় কাহিনি ব্যবহারের পরিপন্থী ছিলেন শঙ্খ ঘোষ তাহলে ভুল ভাবা হবে। তাঁর একাধিক কবিতায় কাহিনি ব্যবহৃত হয়েছে। এমনকি যে-কবিতাটি তিনি শেষ করেছিলেন ওপরে উদ্ধৃত পঙ্‌ক্তি দু’টি দিয়ে, সেই কবিতাটিতেও ব্যবহৃত হয়েছে কাহিনি। আসলে এই কবিতাটি যে-সময়ে লেখা, যতদূর মনে পড়ছে, সেই সময়ে কবিতা-নির্ভর একটি সিরিয়াল শুরু হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কিছু কবিতার নাট্যরুপ দিয়ে পর্বের পর পর্বে সেইগুলি অভিনীত হচ্ছিল। তাই বোধহয় শঙ্খ ঘোষের কবিতাতেও এসে পড়েছিল সেই অনুষঙ্গ। তবে, এমন অনেকেই আছেন যাঁরা মনে করে থাকেন যে, কবিতায় কাহিনি ব্যবহার হওয়া উচিত নয়। কবিতা তো কবিতাই; ফর্মের দিক থেকে গল্পের চেয়ে তো আলাদা সে। কবিতায় তাই গল্প বলা অনুচিত। মহাকাব্যের যুগ শেষ; লোককথায় যে-কাব্য ব্যবহৃত হয়, তাও চরিত্রগতভাবে লিখিতে কবিতার থেকে ভিন্ন। তাই লেখ্য কবিতায় কাহিনির ব্যবহার ক্ষতি করে কবিতার। কথাটি যে সবসময় ঠিক নয়, সেকথা মনে হচ্ছিল দেবজ্যোতি রায়ের এক ফর্মার বই “সমীরের চটি” পড়তে পড়তে। 
এই কৃশতনু বইটি দেবজ্যোতি রায়ের তৃতীয় কবিতার বই। তাঁর প্রথম বইটি প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৯২ সালে। দ্বিতীয়টি ২০১৪ সালে। “সমীরের চটি” প্রকাশ পেয়েছে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে। আজকের দিনে প্রকাশের এই সংযম বিরল। অবশ্য দেবজ্যোতির  কবিতাতেও এই সংযম আছে। আছে কবিতায় কাহিনির ব্যবহারেও। যেমন ধরা যাক এই বইয়ের ‘মৃত্যুদিনে’ কবিতাটির কথাই। কবিতাটি শুরু হয় এইভাবে:
তোমার ভেতর ছিল তন্ময় বাগান
গাছের মাস্তুলে পাখি, সহজ সকাল
পুরোনো বইয়ের গন্ধ, চন্দনের ছায়া
এইটুকু পড়ার পর পাঠকের কৌতূহল জাগে। তিনি ভাবেন, এই ‘তুমি’টি কে? কার ভেতরে ছিল এক তন্ময় বাগান? গাছের ডালে বসে থাকা পাখি? পুরোনো বইয়ের গন্ধ আর চন্দনের ছায়? উত্তর মেলে না। খানিক পরে এই কবিতাটিতেই তিনি লেখেন:
শূন্যতায় ডুবে আছে 
ক্ষীরের পুতুল, ছোটোবেলা, কাটুমকুটুম
শামলী নদীর পাড় ধরে হেঁটে গেলে শুনি
তোমার পায়ের শব্দ
এইবার এইটুকু বোঝা যায় যে, যাঁর কথা বলা হচ্ছে তিনি জুড়ে ছিলেন কবির ছেলেবেলা। ক্ষীরের পুতুলের গল্প, সম্ভবত, পড়ে শোনাতেন তাকে। কবিতাটি শেষ হয় এইভাবে:
রাত বাড়ে
বাতি নেভানোর পর 
সকল রজনীগন্ধা নির্জন ছবির সাথে কথা বলে
ফুলের ভাষায়।
এইবার বোঝা যায় যে, কবির ছেলেবেলা জুড়ে থাকা সেই মানুষটি আর নেই। তিনি ছবি হয়ে গেছেন। সেই ছবিতে ঝুলছে রজনীগন্ধার মালা। এবং ফুলের ভাষায় সেই রজনীগন্ধা কথা বলে ছবিটির সাথে। কিন্তু মানুষটি যে কে–এখনও ঠিক বোঝা যায় না তা। তবে, কবিতাটি পড়তে পড়তে আমার কেন জানি না আমার ঠাকুমার কথা মনে পড়ে। তাঁর গায়েও আমি চন্দনের গন্ধ পেতাম। তাঁর কাছেও শুনতাম গল্প। হয়তো আমার মতোই কারও মনে পড়ে ঠাকুমার কথা। কারও বা দাদুর কথা, দিদার কথা কারও। বাবা-মায়ের কথাও মনে পড়তে পারে কারও কারও। কবিতাটি একটি কাহিনিকে এত মৃদুভাবে, এত আলতো করে স্পর্শ করে থাকে যে, সেই স্পর্শ এক রহস্য তৈরি করে। বুঝিয়ে দেয় যে, কবিতায় কাহিনির ব্যবহার যদি এই রহস্য তৈরি করতে পারে, বলা কথার মতোই যদি কাহিনিটির না-বলা কথা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাহলে সেই কবিতার কাছে পাঠককে ফিরে ফিরে যেতে হয়। তেমনই একটি কবিতা তো “বনলতা সেন”। 
কবি দেবজ্যোতি রায়
তবে কাহিনির সুচারু এবং পরিমিত ব্যবহারের কারণেই এই কবিতাটি আমাদের পুনঃপাঠ দাবি করে না। কবিতাটির নির্মাণও এতই কুশলী যে সেই নৈপুণ্যও দাবি করে কবিতাটির সঙ্গে এক দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের। একটি উদাহরণ দিই। কবিতাটির শেষে কবি জানাচ্ছেন যে, রজনীগন্ধা কথা বলে যিনি আর নেই তাঁর ছবিটির সঙ্গে। কথা বলে ফুলের ভাষায়। শুধু একটি অপরূপ চিত্রকল্প তৈরির উদ্দেশ্যেই কিন্তু এই ছবিটি আঁকছেন না কবি। শেষ স্তবকটি পড়ার পরে আবার যখন ফিরে যাওয়া যায় প্রথম স্তবকটির কাছে, তখন খেয়াল হয় যে, কবি আমাদের প্রথমেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই মানুষটির ভিতরে ছিল ‘তন্ময় বাগান’। অর্থাৎ জীবৎকালেও তিনি ফুলের ভাষা জানতেন। এই ভাষাজ্ঞান জীবন/মৃত্যুর সীমানার অতীত এক বোধি। মৃত্যুর পরেও তাই  ফুল তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারে সহজে। কবিতাটির প্রথম পঙ্‌ক্তিটি আসলে নির্মাণ করে কবিতাটির শেষ পঙ্‌ক্তিটিকে। কিন্তু এতই কুশলী এই নির্মাণ যে, খেয়াল না করলে অলক্ষ্যে থাকে। একইভাবে চমকে দেওয়ার মতো কোনও চিত্রকল্প ব্যবহার করে পাঠককে হতবাক করে দেওয়ার কোনও ইচ্ছে যে এই কবির নেই তা এঁর কবিতা পড়লেই বোঝা যায়। চমকে দেওয়ার ইচ্ছে নেই বটে, কিন্তু তা বলে কি চিত্রকল্পে অভিনবত্ব অপছন্দ করেন দেবজ্যোতি? তা কিন্তু নয়। যেমন, এই কবিতাটিতে দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতেই টুক করে তিনি লিখে ফেলেন, ‘গাছের মাস্তুলে পাখি’। মানে? মানে এই যে, গাছটিকে একটি জাহাজের সঙ্গে তুলনা করছেন কবি। তার একটি ডাল হয়তো বেয়াড়া রকমের বড়ো। তাই সেটি মাস্তুল। তার ওপরে এসে বসেছে পাখি। গাছকে বাংলা কবিতায় নানাভাবে আঁকা হয়েছে। কিন্তু গাছ যে আসলে একটি জাহাজ তা, মনে হয়, এই প্রথম আমরা জানলাম। 
কাহিনি  কবিতায় ইশারা দিয়ে পাঠককে কীভাবে এক নিগূঢ় রহস্যের কেল্লায় বন্দি করে দিতে পারে তার একটি চমৎকার উদাহরণ এই বইয়ের ‘একটি সুইসাইড নোট’ কবিতাটিও। কবিতাটি শুরু হয় এইভাবে:
একটি সুইসাইড নোট খালবিল পার হয়ে
চূর্ণির সবুজ স্রোতে ভেসে যায়।
পচা শামুকের খোলা, কৃষ্ণচূড়া ফুল ভাসে কিছুটা তফাতে
কতদূরে রেলব্রিজ, কালীনারায়ণপুর?
কার সুইসাইড নোট? কেনই বা রেলব্রিজের কথা এল? কোথায় কালীনারায়ণপুর? সুইসাইড নোটটির সঙ্গে রেলব্রিজ আর কালীনারায়ণপুরের সম্পর্কই বা কী? এইসব প্রশ্নের কোনও উত্তর মেলে না। বরং তৃতীয় স্তবকে কবি জানান:
সুইসাইড নোটে লেখা
আমার মৃত্যুর জন্য...
তারপর ঘন অন্ধকার।
আরও রহস্যাবৃত হয়ে যায় মৃত্যুটি। বোঝা যায় না যে, মৃত্যুর কারণটি কী। তবে এই স্তবকটি পড়ার পরে এইটুকু বোঝা যায় যে, মৃত্যুর কারণ জানানো এই কবিতায় কবির লক্ষ্য নয়। তিনি মৃত্যুটিকে ঘিরে এক রহস্যই নির্মাণ করতে চান। শুধু মাত্র একটি পঙ্‌ক্তির দ্বিতীয় স্তবকে জানিয়ে দেন, “ধারাবিবরণী শুনে জিভ চাটে শেয়াল, কুকুর”। বোঝা যায় যে, তিনি তাঁদের কথা বলছেন যাঁরা একজন মানুষের হঠাৎ নেই হয়ে যাওয়ার থেকেও বেশি আগ্রহী আত্মহত্যাটিকে ঘিরে থাকা নানা রসালো আলোচনায়। ইঙ্গিতেই কবি বলে দেন যে, তাঁরা মনুষ্যেতর।
একটি কবিতার কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে ইচ্ছে করছে। কবিতাটির নাম ‘মা’। দেবজ্যোতি লিখেছেন : 
মা বলে ডাকতে গিয়ে
শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
অপরাধী, যেভাবে থমকে যায় প্রমাণের চকিত আভাসে
পড়ে, চমকে উঠতে হয়। কী বলতে চাইছেন দেবজ্যোতি? মা-কে ‘মা’ বলে ডাকতে গিয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে কেন? এই শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে তিনি তুলনা করলেন প্রমাণের চকিত আভাস পেয়ে অপরাধীর থমকে যাওয়ার সঙ্গে। কেন? কেন তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করছেন? বোঝা যায় কবিতাটির পরের স্তবকে --
এইসব বলিরেখা, দু-চোখের জল
মর্মমূলে আমিও জড়িত।
রাতের গভীরে ধামাচাপা তদন্তের পৃষ্ঠাগুলি চারপাশে ওড়ে।
 বোঝা যায় যে, মায়ের দু’চোখের জলের কারণ আরও অনেকের সঙ্গে কবিও। বোঝা যায় যে, কবিরও অবদান আছে মায়ের মুখের বলিরেখাগুলি নির্মাণে। কিন্তু ছেলের কাছ থেকে পাওয়া মায়ের আঘাত, তা বড়োই হোক আর ছোটোই হোক, প্রকাশ্যে আসে না সাধারণত। তদন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়। তবে তদন্ত ধামাচাপা পড়লেও, প্রমাণ ধামাচাপা পড়ে না। তাই দেবজ্যোতি লেখেন:
তোমার আঙুলে পুরোনো আংটির চুনি কেন এত লাল
নিঃসৃত রক্তের ফোঁটা জমেছে পাথরে? 
এই দুই পঙ্‌ক্তি পড়ে, মনে হয়, কবি কল্পনা করছেন যে, অন্দরের রক্তক্ষরণই প্রকাশ্য হয়েছে আংটির পাথরে। নিঃসৃত রক্ত শোষণ করেই আংটির চুনি হয়ে উঠেছে প্রগাঢ় রক্তিম। এইবার বোঝা যায় স্পষ্ট করে যে, মায়ের মুখের বলিরেখা, দু-চোখের জল, হাতের আঙুলের আংটির রক্তিম পাথর এইসবই আসলে প্রমাণ পুত্রের অপরাধের। এই প্রমাণগুলি দেখেই পুত্র থমকে যায় মা-কে ‘মা’ বলে ডাকতে গিয়ে। খুবই উল্লেখযোগ্য আংটির আগে ‘পুরোনো’ শব্দটির ব্যবহার। ওই একটি শব্দই বলে দেয় যে, মায়ের যে রক্তক্ষরণ তা একদিনের নয়, দীর্ঘদিনের। হয়তো সব মায়েদের এই একই গল্প। সব পুত্র কেবল নিজেকে অপরাধী মনে করে না–এই যা তফাত। 
যে-কবিতাগুলি উদ্ধৃত করলাম সেই সব কবিতাগুলিতেই কাহিনির আলতো ইশারা আছে, হাতছানি আছে–এ কথা সত্য। কিন্তু মনে করার কোনও কারণ নেই যে, কাহিনিকে অবলম্বন করেই নির্মিত দেবজ্যোতি রায়ের কবিতাভুবন। এটি তাঁর এই গ্রন্থটির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য, সন্দেহ নেই। কিন্তু বইটিতে এমন কবিতাও আছে যার সঙ্গে কাহিনির কোনও সম্পর্কই নেই। তেমনই একটি কবিতা ‘সৌন্দর্য’:
এলোমেলো শৃঙ্খলায়
পাহাড়ি নদীর ঢঙে
সৌন্দর্য শুয়েছে পাশ ফিরে

দূরে ফুল ঝরে পড়ছে
শান্ত প্রার্থনায়

একটি সুগন্ধ, স্মারকের মতো
হাওয়া তাকে গ্রহণ করেছে

রৌদ্রদগ্ধ পথে আগামীর ছায়া
অথবা আগামী বলে কিছু নেই

শুধু, সৌন্দর্য শুয়েছে পাশ ফিরে
একটি মুহূর্তকে এখানে ধরে রেখেছেন কবি। পাহাড়ি নদীর পাশ দিয়ে পাহাড়ে উঠতে উঠতে দেখা প্রকৃতির বর্ণনা আছে এই কবিতাটিতে। নদীটি এঁকেবেঁকে প্রবাহিত। কিন্তু সেই চলারও আছে একটি নিয়ম। তাই এই চলাটিকে কবির মনে হচ্ছে ‘এলোমেলো শৃঙ্খলা’। ঝরে পড়ছে ফুল। বাতাসে সুগন্ধ। একটু সামনে পড়ে রয়েছে যে পথ, সেই পথে কোথাও হয়তো দেখা যাচ্ছে একটুখানি ছায়া, পাহাড়ের কোনও একটি বাঁকে। নদী, ফুল, বাতাস, ছায়া এইসব কিছু মিলিয়ে এই যে আয়োজন এই আয়োজনের সবটুকুই যেন সৌন্দর্যেরই আয়োজন। কবির মনে হচ্ছে যে, সৌন্দর্য পাশ ফিরে শুয়েছে আর তার দ্যুতিতেই প্রকৃতি হয়েছে অপরূপা। এর বাইরে আর কিছুই নেই, কিছুই মনে হচ্ছে না কবির। একটি মুহূর্তই, সৌন্দর্যের একটি ক্ষণই সত্য হয়ে উঠেছে এই কবিতায়। তাই ‘আগামীর ছায়া’ লেখার পরেই নিজেকে খানিকটা শুধরে নিয়েই যেন দেবজ্যোতি লেখেন, “অথবা আগামী বলে কিছু নেই”। 
     বোধি একজন প্রকৃত কবির কবিতাকে যে ধীময় সৌন্দর্য দেয়, “সমীরের চটি” সেই সৌন্দর্যেরই ভাষারূপ। ছোট্ট এই কবিতার বইটি পাঠ শেষে মনে হয়, এই বইটিই যেন গাছের মাস্তুলে পাখি; ছোট্ট, কিন্তু বাংলা কবিতার যে সাধারণ সমতল তার থেকে একটু উচ্চে স্থাপিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্য