সত্যজিৎ ১০০ || নিবন্ধ || সাবিত্রী জানা সন্নিগ্রহী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 

আন্তর্জাতিক সংসারের অভিভাবক                       সত‍্যজিৎ রায়

                 সাবিত্রী জানা সন্নিগ্রহী

   

সত্যিই কি আমার কোন পরিক্ষিত যোগ‍্যতা আছে উনার সম্বন্ধে লেখা!!!! ধৃষ্টতা করেই ফেলছি একটু। ধরেই ফেললাম মোবাইল---চালু করলাম আঙ্গুল। সেই ১৯৭৩ সাল থেকে সত‍্যজিৎ রায় নামের সাথে প্রথম পরিচয় ---চাঁচের ঘেরা দেওয়া ১৯ পয়সা টিকিটের কাঠের বেঞ্চে বসে "অশনিসংকেত" সিনেমার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের খ‍্যাতনামা ববিতার মাধ্যমে। একাত্ম হয়ে চোখের সামনে ভাসছে-- অনাহারে ক্লিস্ট মানুষের হাড় জিরজিরে চেহারা, খাদ‍্যের জন্য হাহাকার। মনের মধ্যে কেবল গুঞ্জন---সত‍্যজিৎ রায় কি এসব দেখেছেন ??? তখন সবে একাদশ শ্রেণীতে পড়ি। না দিদিমনি বুঝিয়ে বললেন। উনি পড়াশোনা করে এই সিনেমায় অভিনেতা অভিনেত্রী দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন। তারপর থেকে কেবল মনে হোত আর কি কি সিনেমা উনি তৈরী করেছেন? বাড়ির বড়রা যে কোন সিনেমা দেখতে যাওয়ার অনুমতি দিতেন না। কলেজে উঠে সত‍্যজিৎ রায়ের কয়েকটি সিনেমা দেখে নিলাম। এখন মাঝে মাঝে একটু আধটু পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে সত‍্যজিৎ রায় পরিচালিত সিনেমাগুলোর প্রেক্ষাপট। আর বেড়াতে গেলে কোথাও কোথাও খুঁজে বেড়াই সিনেমার স্পট।

-----সত‍্যজিৎ ১০০ এর উপর লিখতে যেয়ে একটু পড়াশোনা ও নিজের স্মৃতিশক্তির উপর নির্ভর করতে হয়েছে। উনার পরিচালিত চব্বিশটি চলচ্চিত্র দেখেছি। কিছু সিনেমা হলে বড় পর্দায় ও কিছু টেলিভিশনের ছোট পর্দায়। কখনো কোলাহলমুখর সকালবেলায় তো কখনো নিস্তব্ধ গভীর রাতে। আমি যতগুলো সিনেমা দেখেছি তারমধ্যে বেশিরভাগ সত‍্যজিৎ রায় পরিচালিত। মনের মনিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে আছে বেশকিছু ঘটনার ঘনঘটা। অবসর সময়ে সেগুলোই আমার সাথী। মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা, বিভূতিভূষণ বন্দ‍্যোপাধ‍্যয়ের লেখা, তারাশঙ্করের লেখা উপন‍্যাস -গল্পের সাথে তিনি একাত্মা ছিলেন। আমার দেখা--আমার স্মরণে তাঁর পরিচালিত ছবিগুলির কিছু কিছু অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।


১৯৫৫ সাল মুক্তি পেয়েছিল বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের আরণ্যক অবলম্বনে "পথের পাঁচালী"।  আমি দেখেছিলাম অনেক পরে। কাশবন ছেড়ে দিদির পেছন পেছন অপু ছুটছে রেল দেখতে দুর্গা মারা যাওয়ার পর কলুঙ্গিতে ভাঁড়ে রাখা গলার পুঁতির মালাটা অপু পুকুরের জলে ছুঁড়ে ফেললে। জলের গোলাকার ঢেউ ক্রমশঃ কিনারার দিকে আসতে আসতে মিলিয়ে গেল। ইন্দিরঠাকুরুণ খাটিয়ার শুয়ে আর উঠলেন না। এদৃশ্য কি ভুলে যাওয়া যায়? দৃশ্যের সাথে সাথে পরিচয় হয়েছিল কানু ব‍্যানার্জী, করুণা ব‍্যানার্জী, ইন্দিরঠাকুরুণ-চুনিবালা দেবী, ছোট্ট ভাইবোন--অপু দুর্গা - রনকী, সুবীর বন্দোপাধ্যায়। বইটি  এগারোটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেল।


১৯৫৬ সাল মুক্তি পেল "অপরাজিত"। অপু লেখাপড়া করতে গেল।শহর কলিকাতায়। দারিদ্র্য দমাতে পারেনি। শহরের চাকচিক্য দেখে অপু গ্রাম ভুলতে লাগলো। 


১৯৫৮ সাল মুক্তি পেল "পরশপাথর"--তুলসী চক্রবর্তী দর্শকদের যুগিয়েছেন পেটফাটা হাসি।


১৯৫৮ সাল তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের (শঙ্কর)"জলসাঘর"। বইটি তিনবার দেখেছি। গভীর রাতে। মনে হয়েছিল এই সিনেমা গভীর রাত ছাড়া বোঝা যাবে না। পাশবালিশে বামহাত রেখে মজে যাওয়া জমিদারীর মালিক বিশ্বম্ভরবাবু--ছবি বিশ্বাস ছাতার বাঁট দিয়ে উঠতি জমিদার মহিমের উপহার দিতে যাওয়া হাতটা টেনে ধরলেন। ----আয়নায় নিজের জয়লাভের প্রতিচ্ছবি দেখে মুচকি মুচকি হাসছেন বিশ্বম্ভরবাবু। না মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ---একসময় জমিদারীর প্রতিপত্তি ছিল। কিন্তু এখন অবশিষ্ট  আছে কেবল মন আর মেজাজ। 


১৯৫৯ সাল মুক্তি পেল "অপুর সংসার"--"অপু ত্রয়ী'' শেষ চলচ্চিত্র। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-অপূর্ব, অপর্ণা-শর্মিলা ঠাকুর। সেই প্রথম চিনলাম ঠাকুর পরিবারের মেয়ে সিনেমা করছেন। তাও আবার কোন এক মুসলিম বিখ্যাত ক্রিকেট খেলোয়াড়ের স্ত্রী। নাম পাতাউদি। ---সন্তান জন্ম দিয়ে মারা গেল অপর্ণা। সে কি মন খারাপ আমার। বাচ্চাটা মা হারা। ওকে কে দেখবে? বাবা অপূর্ব স্ত্রীর শোকে বাচ্চা ছেড়ে চলেই গেল। ---না শেষে বাবার ঘাড়ে চেপে চলেছে শিশু কাজল। বড় পর্দা ধীরে ধীরে নেমে এলো। 

      অপু সিরিজ শেষ হোল। বেশ খুশী হয়েছিলাম সিনেমার পর্দায় অপুর জীবনের তিনটি অংশ দেখে।


১৯৬০ সাল মুক্তি পেয়েছিল "দেবী"। নতুন বৌয়ের সাথে বর থাকবে এটাই তো ঠিক। কিন্তু শ্বশুর মশাই হঠাৎ স্বপ্ন দেখলেন ---বৌমা মানুষ নয় দেবী। শর্মিলা ঠাকুর দেবী। করুণাময়ী দেবী। আলাদা ঠাকুরঘর বানিয়ে হোম, যজ্ঞ, ধূপধূনোর ধোঁয়ায় পূজোপাঠ চলছে। গ্রামের অসুস্থ বাচ্চাদের মায়েরা সারিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে নিজের সন্তান অসুখে ভুগছে। বারবার মনে হচ্ছিল--মায়ের একদম মায়া নেই তো। আবার এ ও মনে হচ্ছিল "দেবী"র কৃপায় ঠিক ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু না নিজের সন্তান ভালো হয়ে ওঠা তো দূরের কথা। মারাই গেল। সিনেমাটা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম ডাক্তার দেখালো না। ঠাকুরের জলে কি অসুখ সারে?? ---"দেবী"---মা সন্তান হারিয়ে উন্মাদের মতো ছুটতে ছুটতে হারিয়ে গেল মাঠের শেষপ্রান্তে।


১৯৬১ সাল মুক্তি পেয়েছিল "তিনকন‍্যা"। কান পেতে বসে থাকতাম বন্ধুদের কথোপকথনে সত‍্যজিৎ রায়ের কোন্ সিনেমাহলে আসছে শোনার আশায়। শুনলাম তিনকন‍্যা। নামটি শুনে মনে হোল কারোর বোধহয় তিনটি মেয়ে। না। বড় পর্দায় প্রথমে ভেসে উঠলো---রবিঠাকুরের গল্পগুচ্ছের তিনটি ছোটগল্প নিয়ে তিনকন‍্যা। পোস্টমাস্টার, মনিহারা ও সমাপ্তি। আগেই পড়া হয় গেছে অনান‍্য গলার সাথে ঐ তিনটি গল্প ও। তিনটি গল্পই তো মনের ভেতর কষ্ট জাগায়। 

প্রথম অংশে--- পোস্টমাস্টার নন্দলাল --অনিল চট্টোপাধ্যায় পড়াশোনা শেখাচ্ছেন সাত আট বছরের বাচ্চা মেয়ে রতনকে --চন্দনা বন্দোপাধ্যায়। কিন্তু গল্পে পড়েছি রতনের বয়স তো বোধহয় বারো। সে যাক্ বেশ ভালোই লাগছে। মেয়েটা পড়াশোনা শিখছে। কিন্তু রতনের পড়াশোনায় বাধা দেয় তার "বিবাহ" নামক একটি বাধা। হঠাৎ আমার মনটা দমে গেল। মেয়েদের পড়তে দিতে চায় না কেন? ম‍্যালেরিয়ায় শরীর ভেঙে যাওয়ায় পোস্টমাষ্টার ফিরে গেলেন বাড়ির পানে।

দ্বিতীয় অংশ--"মনিহারা"। ও বাবা সে তো স্ত্রীকে হারিয়ে মানুষটির কি কষ্ট। গল্পে পড়েছি। ---দুর্যোগের রাতে প্রবল ঝড় বইছে --ফনীভূষন (কালি বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়) মনিমালিকাকে (কনিকা বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়) খুঁজতে বেরিয়েছেন।

তৃতীয় অংশে--"সমাপ্তি"। ও সেই গল্পটা---ডানপিটে মেয়েটা সৌখিন পোষাক প‍রিহিত মানুষটির গায়ে কাদা ছিটিয়ে দিয়েছিল। দরজার সামনে থেকে জুতো নিয়ে পালিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটিকে বিয়ের পর খুব কষ্ট পেতে হয়েছিল। তখন মনে হোত এত ছোট মেয়েদের বিয়ে দেয় কেন?

সিনেমার পর্দায় ভেসে উঠেছে ছাতা হাতে সৌখিন জুতো পরে ধুতির কোঁচা হাতে ধরে এগিয়ে চলেছেন অমূল্য-- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গাছের আড়ালে কতকগুলো বাচ্চা। এদের সাথেই আছে পাগলী মৃন্ময়ী--অপর্ণা সেন। ----অবশেষে অমূল্য-মৃন্ময়ীর বিবাহ, অমূল্য খুব যত্ন করলো ঐ দুষ্ট মেয়েটার। সে কি দারুণ স্বস্তি।


১৯৬২ সালে মুক্তি পেয়েছিল "কাঞ্চনজঙ্ঘা"। কাঞ্চনজঙ্ঘা নামটা শুনেছি অনেকের মুখে। দার্জিলিং এর কাছে। পাহাড়ের চূড়া সূর্যের আলোয় সোনা রঙের হয়ে যায়। পর্দায় ফুটে উঠেছে। এক পরিবারের সবাই বেড়াতে গেছে। রেলিংয়ের ধারে একমনে তাকিয়ে আছে একটি মেয়ে। একটি মাঠে প্রচুর পতঙ্গভুক বা ক‍্যাকটাস জাতীয় উদ্ভিদ। বিষন্ন মনে বসে আছে মেয়েটি। পাশে এসে বসলেন একজন। বুঝতে বেশ জটিল লাগছিল আমার। খুব কম সংলাপ--সবাই কেমন যেন মেপে মেপে কথা বলছিল। ছবি বিশ্বাস, অনিল চট্টোপাধ্যায়, অনুভা গুপ্ত সবাই।


১৯৬৩ সালে মুক্তি পেয়েছিল "মহানগর"। মহানগর তো কলিকাতা। তাহলে কি কলিকাতা নিয়ে সিনেমা?? কলিকাতায় একটি ঘরোয়া বৌএর লড়াইয়ের কথা। আরতি- মাধবী মুখোপাধ্যায়--বাড়ি বাড়ি বিক্রি করেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। স্বামী-অনিল চট্টোপাধ্যায় -সুব্রত কলকাতায় ব‍্যাঙ্কে চাকুরে। কিন্তু সে চাকরি আর থাকে না--ব‍্যাঙ্ক নাকি লাটে উঠেছে। ---মানুষগুলোর জন্য বেশ কষ্ট হচ্ছিল সিনেমার ঘটনা দেখতে দেখতে। না শেষে স্বামী স্ত্রী দু'জনে মিলে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনে।


১৯৬৪ আত্মপ্রকাশ করে "চারুলতা"। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছে পড়া "নষ্টনীড়"। কোন একটি ছেলে এসে স্বামী ভূপতি -সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও স্ত্রী চারুর-মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মাঝে নীরব ঝামেলা বাঁধিয়েছিল।  স্ত্রীর সাহিত্য চর্চা নিয়ে থাকার সুবাদে অমল জায়গা করে নিয়েছে চারুর মনে। কিন্তু অমল ও একদিন ফাঁকি দেয় চারুকে। মনের নীড় ভেঙে গেছে ---এক ভূপতি-চারুর, দুই চারু-অমলের। 


১৯৬৫ ভন্ড বিরিঞ্চিবাবা "কাপুরুষ মহাপুরুষ"--। কেবল মনে আছে বিরিঞ্চিবাবার চ‍্যালা রবিঘোষ। আগুন লাগার গুজবে বিরিঞ্চিবাবা পালিয়ে যাচ্ছেন। সে কি আনন্দ। আচ্ছা হয়েছে ---ভন্ড লোক মানুষ ঠকায়। 


১৯৬৬ সালে আত্মপ্রকাশ করেছিল "নায়ক"। মনে মনে ভাবতাম--,সত‍্যজিৎ রায় প‍রিচালিত এতগুলো সিনেমা দেখলাম কোনটাতেই বিখ্যাত অভিনেতা "উত্তমকুমার"কে দেখতে পেলাম না। আমাদের কলেজ জীবনের সময় উত্তয়কুমার-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রধান দুই নায়ক। কিন্তু উত্তয়কুমারকে সত‍্যজিৎ রায়ের কি পছন্দ হোত না?? নিজের মনেই ভাবতাম। কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সিনেমা এলেই দেখতে ছুটতাম। হঠাৎ শুনলাম হলে সত‍্যজিৎ রায়ের একটি বই এসেছে তাতে নাকি উত্তয়কুমার আছেন। ব‍্যস্ একে তো সত‍্যজিৎ রায়ের ছাড়া যাবে না। আবার উত্তমকুমার আছেন। দেখা যাক্। ----ট্রেনে চলেছেন শর্মিলা ঠাকুর--সাংবাদিক অদিতি আর উত্তমকুমার --পুরস্কার নিতে দিল্লি চলেছেন অরিন্দম। অদিতি তো অরিন্দমকে সহ‍্য করতে পারে না। অরিন্দম তার জীবনের ওঠানামার গল্প শোনায়। অদিতি সহানুভূতিশীল হয়ে অরিন্দমকে নিয়ে খুব ভালো খবর লেখে। ঠিক যেন সে একজন খুব ভালো "নায়ক"। প্লাটফর্মে নেমে অরিন্দম জানালা দিয়ে কথা বলে অদিতির সাথে। সংক্ষিপ্ত সংলাপ। বেশ ভালো লেগেছিল।


১৯৬৬ সাল মুক্তি পায় "চিড়িয়াখানা"---নাকি ব‍্যোমকেশ উত্তয়কুমার চিড়িয়াখানার সাপ-ব‍্যাঙ দেখে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। 


১৯৬৮ এলো বিখ্যাত গান--"গুপী গাইন বাঘা বাইন" সিনেমার ভূতের রাজা দিল বর---সে এক উন্মাদনা। ভূতের বই--ভূত বর দিয়েছে--তিনতালিতে সবকিছু পাওয়া যায়। রাস্তা ঘাটে বাচ্চা থেকে যুবা সব হাতে তিনতালি মারতো আর হি হি করে হাসতো। বড় পর্দায় তিনবার দেখেছি। আমলকি গ্রামের গুপি--তপেন বিশ্বাস, হরিতকি গ্রামের বাঘা --ফচকে রবি ঘোষ। শেষে দু'জনেই দুই রাজকন্যা পেল---শুন্ডী ও হান্ডার রাজার দুই মেয়ে--মনিমালা ও মুক্তামালাকে।


১৯৬৮ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর "অরণ‍্যের দিনরাত্রি"। বনবাংলোয় জোর করে রাত্রিযাপন। পালামৌ, ডালটনগঞ্জ, দুলি এখনো মনের মাঝে ঝটপট করে। সব নামকরা অভিনেতা অভিনেত্রী অভিনয় করেছিলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, সমিত ভঞ্জ, কাবেরী বসু, শমির্লা ঠাকুর।


১৯৭৩ সাল--বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের "অশনি সংকেত"---সেই ১৯৭৩ সালে দেখেছিলাম। স্কুলের হোস্টেল থেকে সব মেয়েদের হেডমিস্ট্রেস পাঠিয়েছিলেন। সত‍্যজিৎ রায়ের সিনেমার প্রতি সেই প্রথম নেশা ধরিয়ে দিয়ে ছিলেন কলকাতা থেকে আসা আমাদের হেডমিস্ট্রেস। শুধুই কেঁদেছিলাম -- সবে সতের বছর বয়স। নরম মনে সংবেদনের প্রাধান‍্য। মানুষগুলো খেতে পাচ্ছে না। এক মাষ্টার মশাইএর ঘরে ও চাল নেই। গ্রামের মেয়েরা শুশনি শাক তুলছে। ঐ শাকসেদ্ধ আর ভাত। পরে জেনেছিলাম গল্পের প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাংলা ১৭৫৭ সাল---দিকে দিকে মন্বন্তর --- ঘরে ঘরে দুর্ভিক্ষের হাহাকার---সমাজের করুণ চিত্র সিনেমার প্রতি চিত্রে। সত‍্যজিৎ রায়ের প্রথম "রঙিন চলচ্চিত্র"। গঙ্গাচরণের ঘ‍রে বাংলাদেশের বৌ অনঙ্গ- --সৌমিত্র চট্টোপাধ‍্যায় ও বাংলাদেশের ববিতা ----কেবলই দুখের সংসার। আর ছুটকি!!!সন্ধ্যা রায়ের দুখের জীবন না কাঁদিয়ে ছাড়েনি।


১৯৭৪ সালে সত‍্যজিৎ রায় উপহার দিলেন এক জাতিস্মরের গল্প--"সোনার কেল্লা"। জাতিস্মর শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে এক বিস্ময়। কিভাবে আগের জন্মের ঘটনা মনে থাকে!!!বিরাট এক জিজ্ঞাসা মনে তোলপাড় করতো। সোনার কেল্লা--জাতিস্মর বালক --মরুভূমি---সব জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়া যেতে পারে এই সিনেমাটিতে। যখন দেখার সুযোগ পেলাম তখন গ্রামে বেশিরভাগ সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। এক আত্মীয় বাড়িতে সাদাকালো ছোট টিভিতে দেখেছিলাম ১৯৮৮ সালে।--- এরপর কি হবে! এরপর কি হবে! প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অজানা উত্তেজনা নিয়ে--ঘটনার প্রবাহ--উটের পিঠে দুলকি চালে গোয়েন্দা--ট্রেনে জাতিস্মর বালককে অপহরণ--এক ভাঙা সোনার বাড়িতে ময়ূরের পেছন পেছন ছুটছে ছোট্ট মুকুল---পেছন পেছন মন্দলোক---গোয়েন্দা এসে হাজির--মুকুলকে উদ্ধার- -ময়ূরকে মারতে দেখে মুকুলের ছুটে পালিয়ে যাওয়া--সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাওয়া---সবশেষে মুকুলের কলকাতার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার বায়না----সে তো মনে এক গভীর দাগ কেটে আছে। দাগ কেটে রেখেছেন ---ফেলুদা-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ দত্ত, জাতিস্মর বালক কুশল চক্রবর্তী।

 ---ঐ সিনেমা দেখে ছেলের কাছে বলেছিলাম আমি রাজস্থান একবার বেড়াতে যাবো। গিয়েছিলাম ভাঙা পা নিয়ে। খুঁজেছি সত‍্যজিৎ রায়কে। পেয়েছি--সোনার কেল্লা তথা জয়সলগড়ের প্রতিটি ইটের অন্দরে সত‍্যজিৎ রায় বেঁচে আছেন। প্রায় দশহাজার দোকানের কোনায় কোনায় নিরব বিরাজ করছেন সত‍্যজিৎ রায়। 


১৯৭৯--"জয়বাবা ফেলুনাথ" মুক্তি। শুনেছিলাম নাকি কাশীতে শুটিং হয়েছে। মছলীবাবা গঙ্গার জল বেয়ে প্রয়াগ থেকে এসেছেন কাশী। অবস্থান করেছেন কাশীর "দ্বারভাঙা ঘাটে"। তপসে ও লালমোহন চলেছেন ঐ ঘাটে মছলীবাবার খোঁজে।মছলীবাবা মনু মুখোপাধ্যায়, মগনলাল উৎপল দত্ত আর ফেলুদা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একে অপরের সাথে টেক্কা দিয়ে গনেশমূর্তির রহস্য ভেদে পরষ্পর বিরোধী কাজ করে চলেছেন। টান টান শিরদাঁড়া - --কোথায় লুকানো আছে!! কখন পাবে!! ধৈর্য্য ধরছিল না। বিজয়ার দিন সিংহের মুখ থেকে বেরোলো মূর্তি।


১৯৮০ "হীরক রাজার দেশে"--হীরক রাজা ---উৎপল দত্তের মূর্তিটি ভেঙে দেওয়ার পর স্বস্তি এলো। সবাই ছড়া বলছিল। একমাত্র এক মাষ্টার মহাশয় উদয়ন-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছড়া বলেননি। গুপী-তপেন, বাঘা-রবি ঘোষ এদের মুখে কেবল গান আর ছড়া। বোধহয় বারোটি গান আছে। গানগুলো অনুপ ঘোষালের গাওয়া। "পায়ে পড়ি বাঘমামা"--গানে বাঘ বস মেনেছিল। এ ভাবা যায়?? ভয় কাজ করছিল--এই বুঝি বাঘ দু'জনকেই খেয়ে ফেলে।


১৯৮৪ মুক্তি পেয়েছিল রবিঠাকুরের গল্প অবলম্বনে "ঘ‍রে বাইরে"-নারীরা বাড়ির ভেতর থাকবে না--বাইরে বেরিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে। এই ভাবনায় জমিদার নিখিলেশ স্ত্রী বিমলাকে ইংরেজি শিক্ষা দিলেন। কিন্তু হোল হিতে বিপরীত। কৃতজ্ঞ সন্দীপের প্রতি অনুরক্ত হয়ে যান বিমলা। জেনে ও জমিদার শান্ত থাকেন। মনের ঘর অশান্ত আর মনের বাইরে শান্ত। এক জটিল অংকের সমাধান।


১৯৯০ "গনশত্রু"---একটি মানুষ কিভাবে সবার শত্রু হয়ে যায়??কেউ কেন পছন্দ করে না? ধর্ম নিয়ে সুবিধা ভোগ--এগুলোই মনে ছাপ ফেলেছিল। তবে বুঝতে একটু কঠিন লেগেছিল। প‍রে জেনেছি এটি একটি ইংরেজি গল্পের অনুবাদ।


১৯৯২ "শাখাপ্রশাখা"--র মুক্তি। বাঙালি পরিবারে এক প্রাচীন বৃক্ষসম বাবা--আনন্দমোহন, শাখাসম চারপুত্র --প্রবোধ-হারাধন চক্রবর্তী, প্রশান্ত--সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, প্রবীর --দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, প্রতাপ--রঞ্জিত মল্লিক। প্রশাখাসম এক নাতি--ডিঙ্গু--সোহম। চারপ্রজন্ম। খুব ভালো লাগছিল দেখতে। সবাই একত্রিত হয়েছে। কিন্তু সবাই একসাথে থাকে না। দুইভাই বাইরে থাকে। একছেলে বাড়িতে থাকে কিন্তু বাবার সাথে দেখা হয় না। এক চাকর দেখাশোনা করে বুড়োবাবার। নাতি দাদুর সাথে গল্প করে। নাতি শহরে থেকে অনেক কিছু শিখেছে। দাদু খুশী হয়। কিন্তু নাতি যখন দাদুকে বলে দাদু আমি দুইনম্বরি জানি। সৎদাদু অসহায় ভাবে আঁকড়ে থাকেন নিজের ঐতিহ্য। বদলে গেছে দিন। সততা হারিয়ে গেছে। এক বিশাল ব‍্যবধান---দাদু নাতির জীবন প্রবাহে। গাছের কান্ড, শাখা প্রশাখা, নতুন কুঁড়ির মাঝে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের গভীরতা। ছিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের ধারা। কষ্ট লেগেছিল। যেযার কাজে ফিরে যাওয়া---বুড়ো একা উদাস চোখে-----


"আগন্তুক"--হঠাৎ কোথা থেকে এলেন সুধীন্দ্র -দীপঙ্কর,  অনিলা --মমতাশঙ্করের দূর সম্পর্কের নৃবিজ্ঞানী কাকা মনমোহন মিত্র --উৎপল দত্ত। শান্তিনিকেতনে সাঁওতালি গ্রামে নাচ দেখছেন। ---সমস্ত সম্পত্তি কাকা দিয়ে গেলেন অনিলা -সুধীন্দ্রকে। প্রথম থেকেই সন্দেহ --ভদ্রলোক কে? কি উদ্দেশ্যে এসেছেন। সমাপ্তি সম্পত্তি দানে।

    সত‍্যজিৎ রায় পরিচালিত এই সিনেমাগুলো দেখেছি। স্ম‍রণ নিয়েছি আমার স্মৃতির দুয়ারে আর গুগুলদাদার পাতায়। বেনারস যেয়ে খুঁজেছি বিরিঞ্চিবাবার ঘাট। 

আর একটি চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সবচেয়ে বড় পুরস্কার "অস্কার" নিচ্ছেন। চোখে দেখিনি। খবরের কাগজে পড়েছি।

আমার দেখা সত‍্যজিৎ রায় পরিচালিত ২৩ টি চলচ্চিত্র মনের মধ্যে যখন তখন আনাগোনা করে।

তিনি তাঁর কাজের সুবাদে বহু অভিনেত্রী -অভিনেতাকে একত্রিত করে কাজ করেছেন। হাজার হাজার মানুষের মনের মধ‍্যে লুকিয়ে আছেন সিনেমা পরিচালক সত‍্যজিৎ রায়, গোয়েন্দা কাহিনীকার সত‍্যজিৎ রায়। বিশেষ জুটি --"সত‍্যজিৎ-সৌমিত্র"--৩৪ টি সিনেমার ১৪টিতে পরিস্ফুট। বহু বিদেশি পরিচালক তাঁর অনুপ্রেরণায় বিখ্যাত হয়েছেন‌। তাইতো তিনি আন্তর্জাতিক সিনেমা জগৎ মানুষদের অভিভাবক। শিশুমনে সত‍্যজিৎ তো গেঁথে আছেন। আর সিনেমার শুটিংয়ের স্থানে স্থানে তাঁর পদধ্বনি সুস্পষ্ট।

আমার শতকোটি প্রণাম।।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য